এত কিছুর পর জানা গেল পুলিশই ঘাতক

0
220

গণমাধ্যম ডেস্ক: দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি আবাসন প্রকল্পের নির্জন রাস্তায় অজ্ঞাত হিসেবেই পড়ে ছিল বৃদ্ধ মো. ইউনুস হাওলাদারের গলা ও পেট কাটা লাশ। গত ২৫ জুন সকালে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ইউনুস হাওলাদারকে কে বা কারা এবং কেন হত্যা করল জানতে পুলিশের যখন গলদঘর্ম অবস্থা, তখন আশার আলো হয়ে দেখা দেয় একটি ফোন কল। পরে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (কললিস্ট) যাচাই করে হতভম্ভ তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

কললিস্টের সূত্র ধরে ঘাতক মো. ওহিদ ওরফে সুমন (নিহতের বাড়ির ভাড়াটিয়া) ও মো. ছাবের ওরফে শামীমকে (পুলিশের সোর্স) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পরই বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য হত্যাকাণ্ডের মূল ‘নায়ক’ই পুলিশ।

জানা গেছে, নৃশংস এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড রাজধানীর শ্যামপুর থানার এএসআই নুর আলম (থানা থেকে ক্লোজড হয়ে বর্তমানে তিনি ডিএমপির ওয়ারি বিভাগের ডিসি অফিসে সংযুক্ত)। নারীঘটিত একটি মামলা থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিহতের কাছে দাবির ৩ লাখ টাকা ছিনতাই করতেই গ্রেপ্তার দুজনকে দিয়ে ইউনুস হাওলাদারকে খুন করান তিনি।

জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের এই তিনজন ছাড়াও মুখোশ পরা অচেনা এক যুবক জড়িত। পুলিশ অভিযুক্ত সুমন ও সাবেরকে গ্রেপ্তার করলেও এএসআই ও মুখোশধারী যুবক এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ এএসআই নুর আলমের নীল নকশায় এই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সুমন।

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই গোলাম মোস্তফা বলেন, ৩ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই ইউনুস হাওলাদারকে খুন করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত রাজধানীর শ্যামপুর থানার এক এএসআই, যা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন খুনে সরাসরি অংশ নেওয়া সুমন।

গোলাম মোস্তফা আরও জানান, ঘটনার দিন (২৪ জুন, বেলা ২টা ৫৪) নিজেদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কথা বলেন ওই এএসআই ও সুমন। এর আগে-পরে আরও কয়েকবার কথা হয় তাদের। সেদিন তাদের মধ্যে সর্বশেষ কথা হয় ১৯টা ৪৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে (সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিট)। হত্যাকাণ্ডের পর তাদের কথা হয় মধ্যরাত ১২টা ৩১ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে। হত্যার পর নিহতের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা রাখা একটি লাল ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় সুমন, সাবের ও মুখোশ পরা অচেনা ওই যুবক।

ঘটনা ঘটিয়ে তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে পোস্তগোলা ব্রিজ পেরিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকা অভিযুক্ত এএসআইয়ের কাছে টাকার ব্যাগটি দেয়। তখন দুই হাজার টাকা বের করে সুমনকে পুরো ঘটনার দায় চাপিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রাতের মধ্যে ঢাকা ছাড়তে বলেন ওই এএসআই। ঘটনার পরদিন সকাল ১০টা ৯ মিনিটেও মোবাইল ফোনে এই দুজনের কথা হয়। তখন সুমন সিলিটে অবস্থান করছিলেন। ওই এএসআই ছিলেন হাতিরঝিল এলাকায়। অভিযুক্ত ওই এএসআই বর্তমানে পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন।

এসআই গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, ঘটনা তদন্তের প্রথম দিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সদিচ্ছা থাকলেও সুমন আদালতে খুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাতে ওই এএসআইর নাম আসলে রহস্যজনক ভুমিকা পালন করছেন ওসি। এত তথ্যপ্রমাণ থাকার পরও তিনি তদন্তের বিষয়ে সহযোগিতা তো করছেনই না, উল্টো অভিযুক্ত এএসআইকে গ্রেপ্তারে পদে পদে বাধা দিচ্ছেন।

তবে এসআই গোলাম মোস্তফার অভিযোগ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মনিরুল ইসলাম।

আদালতে দেওয়া সুমনের জবানবন্দি সাজানো দাবি করে অভিযুক্ত এএসআই নুর আলম বলেন, কী করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমার নাম এলো তা বুঝতে পারছি না। এ ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই।

নিহতের স্ত্রী মারুফা খানম জানান, শ্যামপুরের পশ্চিম ধোলাইরপাড় এলাকার দুটি বাড়ি ভাড়া দিয়েই চলতেন ইউনুস হাওলাদার। স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চলতি বছরের প্রথম মাসে তাদের ১১/১ নম্বর বাড়ির ৫ তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয় এক দম্পতি। ১৯ জানুয়ারি বিকালে শ্যামপুর থানার এসআই মাহাবুব আলমসহ কয়েক পুলিশ সদস্য ওই দম্পতির বাসায় অভিযান চালান। সেখানে ৩ ঘণ্টা অবস্থানের পর ১১ দিন আগে ভাড়ায় আসা ওই দম্পতিসহ কয়েক জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা দেন তিনি।

এদিকে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইউনুস হাওলাদারকেও ওই মামলায় জড়িয়ে দেন এসআই মাহাবুব আলম। এর পর ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নজরুল ইসলাম চার্জশিট থেকে ইউনুস হাওলাদারকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে মারুফা খানমের কাছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। মারুফা পরে জানাবেন বলে ওই এসআইকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সেদিন বিদায় দেন।

অশ্রসিক্ত মারুফা খানম বলেন, আমার সরলসোজা স্বামীটারে শ্যামপুর থানার এক পুলিশ মিথ্যা মামলায় জড়াইল। একই থানার আরেক পুলিশ ওর প্রাণটাই কাইড়া নিল। প্রকাশ্যে ঘুইরা বেড়ালেও এখন ঘটনার মূল হোতা এএসআই নুর আলমকে গ্রেপ্তার করতে দিচ্ছে না দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার আরেক পুলিশ। দায়ী শ্যামপুর থানার তিন পুলিশ সদস্য, সোর্স ছাবের ও সুমনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান মারুফা খানম ও তার ছেলে আতিকুজ্জামান ঈগলু। তাদের সঙ্গে কথোপকোথনের ধারণকৃত পুরো ভিডিও চিত্র আমাদের কাছে সংরক্ষণে রয়েছে।

এদিকে খুন হওয়ার কয়েক দিন আগেও শ্যামপুর থানার অদূরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় নিহত মো. ইউনুস হাওলাদারের। তখন তিনিও অভিযোগ করেছিলেন শ্যামপুর থানার এসআই মাহাবুব আলম তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছেন। সম্মানহানি তো হয়েছেই, বুড়ো বয়সে অপমানজনক মামলা থেকে নিস্তার পেতে থানা পুলিশের কাছে ধরনা দিচ্ছেন তিনি। সেদিনের সেই কথোপকোথনের ধারণকৃত ভিডিও চিত্রও রয়েছে আমাদের কাছে।

আদালতে জবানবন্দিতে সুমন জানান, নারী পাচার মামলা থেকে মুক্তি পাইয়ে দিতে নিহত ইউনুস হাওলাদারের কাছে ৪ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন এএসআই নুর আলম। দেন-দরবারের একপর্যায়ে ৩ লাখ টাকা দিতে রাজি হন ইউনুস। এই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সুমন। তাকে ২৩ জুন বিকালে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনে আসতে বলেন এএসআই নুর আলম। সাবেরকে নিয়ে আসেন এএসআই। সেখানেই খুনের পরিকল্পনা হয়।

সে অনুযায়ী ২৪ জুন রাত ৯টার দিকে টাকা নিয়ে ইকুরিয়া বিআরটিএর সামনে ইউনুস হাওলাদারকে আসতে বলেন তারা। ওই বৃদ্ধ যথাস্থানে পৌঁছলে একটি অটোরিকশায় তাকে ওঠানো হয়। গাড়িতে আগেই সাবের ও মুখোশ পরা এক যুবক বসা ছিলেন। রাস্তা খারাপ থাকায় তারা হেঁটেই এগোতে থাকেন। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ হাউজিং প্রজেক্টের উত্তরে গোলাম কিবরিয়ার বাড়ির পাশে নির্জন রাস্তায় আসতেই সুমন ইউনুসকে ল্যাং মেরে ফেলে দেন। এ সময় তার বুকে উঠে গলায় ও পেটে ছুরি চালায় সাবের।
হত্যার পর তারা ইউনুসের কোমরে বাঁধা লাল রঙের টাকার ব্যাগটি নিয়ে অটো রিকশাযোগে পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন এএসআই নুর আলম। তার কাছে টাকার ব্যাগ দেন সাবের। সুমনকে দুই হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ার হুমকি দেয় ওই এএসআই। না হলে পুরো হত্যাকাণ্ডের দায় তার ওপর চাপানো হবে বলে জানান ওই পুলিশ সদস্য। ভয়ে রাতেই বাসযোগে সিলেট চলে যান সুমন। ২৮ জুন স্ত্রীকে নিয়ে বাগেরহাটের চিতলমারী এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেন তিনি। সেখান থেকেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

সূত্র : আমাদের সময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here