খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড: মিথ আর মিথ্যাচারের গল্প

0
30

দীর্ঘ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সকালে নিহত তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ তার দুই সহযোগী কর্নেল হুদা এবং লে.কর্নেল হায়দার হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য আজও উদঘাটন হয়নি। বরং এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচন না করে দিনের পর দিন নির্বিবাদে চলেছে প্রচার-অপপ্রচার আর মিথ্যাচার। মূল সত্যটা তাই আজও প্রকাশিত হয় নি। কোনো সরকারেরই কোনো অথিরিটি এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য, কারা কার নির্দেশে হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত করেছে তা পরিষ্কার করেনি। উল্লিখিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও কোনো সময় নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়েছে এমনটি জানা যায়নি। ফলে এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিথ আর মিথ্যাচারই প্রবাহমান।

তবে যুগ যুগ ধরে সেই মিথ্যাচারের বড় দায়ভার বহন করতে হয়েছে জাসদ নেতৃবৃন্দ এবং ৭৫ এর ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভূত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে। ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনার পর যারাই ক্ষমতাসীন হয়েছে তারাই প্রচার করেছে খালেদ মোশাররফসহ তার দুই সহযোগী কর্নেল হুদা এবং লে.কর্নেল হায়দারকে হত্যা করেছিল জাসদের সেসময়কার সহযোগী সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈনিকেরা। উল্লিখিত হত্যাকাণ্ডের জন্য বারবার জাসদকেই দায়ী ও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। ৭৫ এর ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ আর তুমুল মিথ্যা প্রচারণার প্রেক্ষিতে জনমানসে এই ধারণা প্রবল হয়ে উঠে যে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল কূশীলব। তারাই হত্যা করেছিল স্বল্প সময়ের সেনা সেনা প্রধান হওয়া মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে। এই মিথ্যা প্রচারণায় যেমন বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে তৎকালীন সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার, তেমনি ভূমিকা রেখেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। মূলধারার পত্রপত্রিকাও কখনই প্রকৃত অনুসন্ধান না চালিয়ে জাসদকেই দোষারোপ করে গেছে। আবার রাজনৈতিকভাবে জাসদকে ঘায়েল এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক বুদ্ধিজীবীও সময় ও সুযোগ পেলেই খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডে জাসদের সম্পৃক্ততার কথা অন্ধের মতো জাহির করে গেছেন এখনও করে থাকেন।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া তৎকালীন সময়ের অনেক অফিসার যারা ৩ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বর ওপর লিখেছেন সেখানেও দেখা গেছে অনেক তথ্যে গোলমাল রয়েছে। কোথাও কোথাও একেবারেই অনুমান থেকে লেখা হয়েছে। কোথাও দেখা গেছে মূল ঘটনা প্রবাহ পাশ কিাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে সত্য ইতিহাসের বদলে মানুষ মিথ্যা ইতিহাসকেই বেশি গ্রহণ করেছে। সেই সব অনুমান নির্ভর লেখায় একবাক্যে বলা হয়েছে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেছিল জাসদের সহযোগী বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈন্যরাই। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সাথে অনেক নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। যে তথ্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে জাসদ বা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নয়, ৭ নভেম্বর ভোরে মেজর জেনারেল খালেদকে হত্যা করেছিল অন্য একটি পক্ষ। যে পক্ষের সাথে জাসদের চিন্তা-চেতনার কোনো সংযোগ ছিল না। যে পক্ষের সাথে জাসদ নেতৃবৃন্দ এবং কর্নেল আবু তাহেরের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

আসুন একটু ইতিহাসে প্রবেশ করি। ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর নানা ঘটনা প্রবাহে ৩ নভেম্বর রাতে পাল্টা এক অভূত্থানের মধ্যে দিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে সেনাপ্রধান হন মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম পিএসসি। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সেনাবাহিনীতে চীফ অফ দ্যা জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। শপথ গ্রহণের আগে তাঁকে নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল র‌্যাংক পরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র চারদিন তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ৭ নভেম্বর সকালে গণভবন ও সংসদভবন এলাকায় অবস্থিত ১০ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী সেক্টর-২ এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অফুতোভয়, চৌকষ এই সেনা অফিসারকে তাঁর আরও দুই সহযোগী কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা বীরবিক্রম এবং লে. কর্নেল এটিএম হায়দার বীরবিক্রমসহ হত্যা করা হয়। সিপাহীদের বিদ্রোহের খবর পেয়ে ৬ নভেম্বর রাতে ১০ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নিরাপদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত জেনেই সেনা প্রধান খালেদ মোশাররফ দুই ডেপুটিসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানেই করুণভাবে নিহত হতে হয় তাকে।

সম্প্রতি ৭৫ এর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ-এর নেতৃত্বে যে অভূত্থান হয় সেই অভূত্থানে অংশ নেওয়া দুজন অফিসারের লেখা দুটি বই-এ রকম ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ৭ নভেম্বর সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং তার দুই সহযোগী হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীর শওকত। মূলত তাঁর নির্দেশেই হত্যা করা হয় তাদেরকে। কিন্তু সুকৌশলে বিষয়টি জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে যেসব অফিসাররা খোন্দকার মুশতাক গং এর বিরুদ্ধে অভূত্থান করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তৎকালীন ৪৬ ডিভিশনের প্রধান কর্নেল শাফায়াত জামিল, কর্নেল আব্দুল মালেক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম বীরবিক্রম, এইচ এম আব্দুল গাফফার বীর উত্তম, মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম, মেজর ইকবাল হোসেন চৌধুরী, মেজর আমিনুল ইসলাম, মেজর নাসির উদ্দিন, ক্যাপ্টেন হাফিজ উল্লাহ, ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম তাজ, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবীর বীর প্রতীক, ক্যাপ্টেন দীপক দাসসহ অন্যরা।

এই গ্রুপের মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম ছিলেন খালেদ মোশাররফের একান্ত বিশ্বস্তজন। তিনি ‘সৈনিক জীবন, গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন, যেটি প্রকাশ করেছে প্রথমা। এই বই-এর এক অংশে খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে লেখা হয়েছে এভাবে ‘মধ্যরাতে ক্যান্টনমেন্টে সেনা বিদ্রোহের খবর পেয়ে খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান, কর্নেল হুদা এবং লেফট্যান্যান্ট কর্নেল হায়দার। হায়দার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক ছিলেন। বিয়ের কনে দেখার জন্য ৫ নভেম্বর ঢাকায় আসেন। খালেদ মুক্তিযুদ্ধকালে তার কমান্ডার ছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করার জন্যই হায়দার বঙ্গভবনে এসেছিলেন। বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে তারা কাঁঠালবাগানে খালেদের এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে ইউনিফর্ম খুলে সিভিল পোশাক পরলেন। এখান থেকে টেলিফোনে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগের পর গভীর রাতে খালেদ, হুদা ও হায়দার শেরেবাংলানগরে ১০ম ইস্টবেঙ্গলে যান। নুরুজ্জামান সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন।

খালেদ ১০ম বেঙ্গলে পৌঁছার পর পরিবেশ মোটামুটি শান্ত ছিল। তারা খুব ভোরে সেখানে নাশতাও করেন। কিন্তু সেনাবাহিনী থেকে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক ১০ম বেঙ্গলে পৌঁছে সেনিকদের উত্তেজিত করে তোলে। এই ব্যাটেলিয়ানের মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ক্যাপ্টেন জলিল একদল উত্তেজিত সৈনিকদের নেতৃত্ব দিয়ে খালেদ, হুদা, হায়দারকে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে খালেদ ধীরস্থির ছিলেন, একের পর এক সিগারেট ফুঁকছিলেন। হুদা কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েন। খালেদ তাকে বলেন, ‘টেক ইট ইজি ভাগ্যে যা আছে, তা-ই হবে।’ হায়দার জলিলকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্বিনীত, উত্তেজিত জলিল এবং তাঁর সঙ্গীরা তাদের সঙ্গে দুব্যবহার করে এবং এক পর্যায়ে হত্যা করে। গুলি করার আগে হায়দারের পরনের কমান্ডো জ্যাকেটটি জলিল খুলে নেয়। মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি, সাহসী অফিসারদের এমন করুন পরিণতি একেবারেই অকল্পনীয়। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্ট থেকে একজন সিনিয়র অফিসারের টেলিফোন পেয়েই জলিল উত্তেজিত হয়ে এ ঘটনা ঘটায়। অনেকের ধারণা মীর শওকত এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। ( পৃষ্ঠা: ২২৩, সৈনিক জীবন, গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর, হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম)। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, মেজর হাফিজ এবং মীর শওকত দীর্ঘদিন একই সাথে বিএনপির রাজনীতি করেছেন। কিন্তু তিনি যে সূত্রটি দেন তা নিয়ে কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কখনই আলোচনা হয়নি।

আবার একই কথা বলেছেন খালেদ মোশাররফের আরেক সহযোগী এইচ এম আব্দুল গাফফার বীর উত্তম। সেনা কর্মকর্তা এইচ এম আব্দুল গাফফার বীর উত্তম ৭৫ এ লে. কর্নেল র‌্যাংকধারী একজন সাহসী অফিসার ছিলেন। ৩ নভেম্বরের অভূত্থানের সময় তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে প্রথমা প্রকাশনী থেকে তার লেখা ‘স্মৃতিময় মুক্তিযুদ্ধ ও আমার সামরিক জীবন’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের রহস্যাবৃত হত্যাকাণ্ড অংশে তিনি লিখিছেন-‘দ্রুত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে খবর আসছিল যে সেখানকার কমান্ডার ও সাধারণ সৈনিকেরা জেনারেল জিয়ার প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ঢাকা সেনানিবাসেও জাসদের সদস্যরা বাদে ব্যাপক সংখ্যক সাধারণ সৈনিক জিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছিল। জাসদের মিথ্যা প্রচারণায় এবং আপন মা-ভাইদের কর্মকান্ডের ফলে ইতিমধ্যে জেনারেল খালেদ মোশাররফের মতো একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় এজেন্টরুপে ব্র্যান্ড হয়ে গিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর সকালেই খবর ছড়িয়ে পড়লো যে বঙ্গভবন থেকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ. কর্নেল নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার প্রেসিডেন্ট পুলের একটি কার নিয়ে সাভারের দিকে যাওয়ার পথে বিপ্লবীদের হাতে নিহদ হয়েছেন। জানা যায় যে জেনারেল জিয়া এদের অক্ষত অবস্থায় ও সসম্মানে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা শিকার হয়েছিলেন একটি হত্যাকাণ্ডের। তাদের নিহত হওয়ার বিষয়ে একাধিক বর্ণনা বিদ্যমান। শোনা যায়, মোহাম্মদপুরের আইয়ুব গেট বা আসাদ গেটের কাছে তাদের বহনকারী কারটি নষ্ট হয়ে গেলে তারা নির্মিয়মান জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত ১০ম ইস্ট বেঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পাঁয়ে হেঁটে তারা তখন ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নওয়াজিশের (পরে ব্রিগেডিয়ার, জিয়া হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত) অফিসে যান। উল্লেখ্য ১০ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ফেণীর বিলোনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম কমান্ডিং অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (পরে লে. কর্নেল)। এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল নওয়াজিশ ব্যাটালিয়নের সিও হন।

ধারণা করা হয়, খালেদ মোশাররফ মনে করেছিলেন, যেহেতু এটি তার নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তাই তিনি সেখানে আশ্রয় পাবেন। কিন্তু একটি বর্ণনা মতে তারা যখন নওয়াজিশের অফিসে যান তখন সশস্ত্র উচ্ছৃঙ্খল বিপ্লবী সৈনিকেরা তাদের ঘিরে ধরে এবং তাদের সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। অনেক তর্কাতর্কির পর ঘাতক সৈনিকেরা তাদের ব্যাটেলিয়ান এমটি পার্ক তথা গাড়ির গ্যারেজে নিয়ে যায়। শুনেছি তাদের তাদের তিনটি চেয়ারে বসানো হয় এবং সৈনিকরা তাদের জিজ্ঞেস করেছিল যে মৃত্যুর আগে তাদের কোনো চাওয়া পাওয়া আছে নাকি। খালেদ তার পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ঘাতক সৈনিকদের অনুমতি নিয়ে ধুমপান করেন। সিগারেট খাওয়া শেষ হলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ওকে আই অ্যাম রেডি। এরপর তাদের গুলি করে ও পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

অন্য একটি বর্ণনা মতে জানা যায়, যদিও জিয়া এদের হত্যা না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তথাপিও জিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী বীর উত্তমের ব্যক্তিগত আদেশে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নওয়াজিশ এদের হত্যা করান। কথিত আছে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নওয়াজিশের আদেশে ক্যাপ্টেন আসাদ এবং ক্যাপ্টেন মনসুর এদের হত্যায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই বর্ণনা মতে, মূল হত্যাকারীদের আড়াল করার জন্যেই এই হত্যাকাণ্ডে ‘বিপ্লবী সেনিক’দের জড়িয়ে গল্প ফাঁদা হয়েছিল। তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার এমন মর্মান্তিক জীবনাবসান, তা-ও আবার আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই, এ দুঃখ ভুলবার নয়। (পৃষ্ঠা ২০৬, ‘স্মৃতিময় মুক্তিযুদ্ধ ও আমার সামরিক জীবন’, এইচ এম আব্দুল গাফফার বীর উত্তম)।

আসুন এবার দেখি এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কী বলেছেন ৪৬ ডিভিশনের প্রধান কর্নেল শাফায়াত জামিল। ৩ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফ-এর নেতৃত্বে যে অভূত্থান সংঘটিত হয় সেখানে অন্যতম ভূমিকা রাখেন ৪৬ ডিভিশনের প্রধান কর্নেল শাফায়াত জামিল। তার লেখা ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ বইয়ের ১৪৪ পৃষ্ঠায় খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড নিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- ‘শেষ রাতের দিকে দশম বেঙ্গলের অবস্থানে যান খালেদ। বেলা এগারোটার দিকে এলো সেই মর্মান্তিক মুহূর্তটি। ফিল্ড রেজিমেন্টে অবস্থানরত কোনো একজন অফিসারের নির্দেশে বেঙ্গলের কয়েকজন অফিসার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খালেদ ও তার দুই সঙ্গীকে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি আজো। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত বারোটার পর ফিল্ড রেজিমেন্টে সদ্যমুক্ত জিয়ার আশেপাশে অবস্থানরত অফিসারদের অনেকেই অভিযুক্ত হবেন এ দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সেনানায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের হত্যার দায়ে। তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কার্নেল তাহের এবং তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দও এ দায় এড়াতে পারবেন না।’ কর্নেল শাফায়াত জামিলের লেখায় এটি স্পষ্টত যে খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেছে জিয়ার অনুগত অফিসাররা, সিপাহীরা নন। সেই অফিসার কারা ছিলেন?

এটাতো স্পষ্ট ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে জাসদের নেতৃত্বে কর্নেল তাহেরের পরিচালনায় সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভূত্থানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় কোনো অফিসারের সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ নেই। জুনিয়র কমিশন অফিসার (জেসিও) এবং নন কমিশন অফিসার (এনসিও) ও বিভিন্ন ইউনিটের সংঘবদ্ধ সিপাহীদের নেতৃত্বেই অভূত্থান হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন- খালেদের বুকে ও কপালে যে অফিসাররা গুলি করেছিলেন সেই অফিসার কারা ছিলেন? কোথায় গেলেন তারা?

অন্যদিকে সেসময় রক্ষীবাহিনীতে কর্মরত কর্নেল আনোয়ারুল আলম তার লেখা ‘রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা’ বই-এর ১৭৮ পৃষ্ঠায় খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেছেন- ‘অভূত্থান ব্যর্থ হলে খালেদ মোশাররফ কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দারকে সাথে নিয়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থানরত ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটে যান। সেনাবাহিনীর সঙ্গে রক্ষীবাহিনীর আত্তিকরণের পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান কার্যালয় মিনি ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ওখানে ছিল ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান। এই রেজিমেন্ট খালেদ মোশাররফরে নির্দেশে রংপুর থেকে এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। খালেদ মোশাররফ ঐ রেজিমেন্টের সদর দপ্তরকে নিরাপদ মনে করে খোন্দকার নাজমুল হুদা এবং এটিএম হায়দারকে নিয়ে সেখানে যান। দুর্ভাগ্যের বিষয়, খালেদ মোশাররফ যে স্থানে নিরাপদ মনে করেছিলেন সেখানেই তিনি নিহত হন। তার সঙ্গে নিহত হন খোন্দকার নাজমুল হুদা ও এটিএম হায়দারও।’

খালেদ মোশাররফের অন্যতম দুই সহযোগী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বীর বিক্রম এবং প্রয়াত লে.ক এইচ এম আব্দুল গাফফার বীরউত্তম তাদের লেখা দুটি বইতে খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে যার নাম যুক্ত করেছেন সেই তথ্যটি কিন্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন ধরে জাসদ আর আবু তাহেরকেই সবাই দোষারোপ করেছে। এখনও সেই মিথ আর মিথ্যাচারের গল্প কিন্তু ভাঙা যায়নি। আর তাই মূল হত্যাকারী বাইরেই থেকে গেল। সূত্র : চ্যানেল আই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here