চন্ডিছড়ির চা বাগানে হঠাৎ একদিন

0
41

রাজধানী ছেড়ে আশেপাশের লোকালয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। এ কারণে নগরের ব্যস্ত মানুষেরা সুযোগ পেলেই বাইরে ছুটেন। একটু সতেজ হওয়ার জন্য চলে যান দূর-দূরান্তে। আসলেই ঢাকার বাইরে গেলে দ্রুত প্রকৃতির কাছে যাওয়া যায়। নির্মল আনন্দ হাতের মুঠোতে পাওয়া আর খুব কঠিন হয় না। ঢাকা মানেই সারাদিন যানজট। রাস্তায় গাড়ি আর গাড়ি। আর চারপাশের দেওয়ালগুলো চোখকে ভীষণ আটকে রাখে।

২৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার প্রকৃতির কাছে যাওয়ার তাড়নাটা একটু বেশি অনুভূত হয়। আর তাই সকালে হঠাৎ করেই স্ত্রী সূচি আর একমাত্র কন্যা অনন্তিকে নিয়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হই। অভিপ্রায় হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরি গাঁয়ের পাহাড়ে পাঁচ তারকা মানের ‘দ্যা প্যালেস’ রিসোর্ট দেখা। এই রিসোর্টের গল্প অনেক শুনেছি, যাওয়া হয়নি। সেই অভিপ্রায় ধরেই গাড়ি নিয়ে এগুতে থাকলাম। যাওয়ার পথে ভৈরবের জান্নাত হোটেলে নাস্তাও যেন এক অপূর্ব আনন্দ।

সিলেট জোনের সুহৃদ দুজন ডিআইজি আমাদের এই চলার পথে সবকিছু সমন্বয় করছেন। বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম সেই কাঙ্খিত ‘দ্যা প্যালেস’ রিসোর্টে। প্যালেসের প্রবেশদ্বারে যেতেই বুঝলাম এখানে চোখ ধাঁধানো অনেক কিছুই আছে। প্রায় ১৫০ একর জমিতে শুধু পাহাড়ি উঁচু উঁচু টিলা। টিলায় টিলায় ভবন। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির ৩০ হাজার গাছ। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে এ পরিসরটুকু। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি অসাধারণ ঝর্ণা। এরপর ব্যাটারি চালিত গাড়িতে ঘুরে দেখলাম পুরো রিসোর্ট। সুন্দর করে সাজানো-গোছানো।

এককথায় নয়নাভিয়াম। একটি পরিপূর্ণ রিসোর্টে যা আছে তার সবটুকুই যেনো দেখতে পেলাম। ঝুলন্ত ব্রীজটা যেন এই রিসোর্টে আরও বাড়তি আকর্ষণ। কিন্তু কপাল খারাপ। আগে থেকে বুকিং না দেওয়ায় এখানে থাকার কোনো সুযোগ হলো না। তবে দ্রুত যতটুকু দেখলাম তাতে পূর্ণ তৃপ্তি না পেলেও বুঝলাম-পরবর্তীতে একবার আসতেই হবে।

অগত্যা ‘দ্যা প্যালেস’ দেখে ওখান থেকে রওনা দিলাম হবিগঞ্জেই ‘ডানকান ব্রাদার্স’- এর চা বাগানের উদ্দেশে। পাহাড়বেষ্টিত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যে অসংখ্য চা বাগান রয়েছে এর মধ্যে ‘ডানকান ব্রাদার্স’-এর চা বাগান অন্যতম। এটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটের চন্ডীছড়িতে। এই চা বাগানের ম্যানেজার প্লাবন রায়। তার কাছেই ছুটে যাওয়া। গন্তব্যে পৌঁছাতে তিনিই আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তার বাংলোতেই আমরা রাত্রিযাপন করি।

আসলে চা বাগানে ঢুকলে মনটা অন্যরকম হয়ে পড়ে। সাজানো গোছানো সারিবদ্ধ চা বাগান। সব গাছ একই মাপের। সারিবদ্ধ গাছেন চারদিকে রোদ আর ছায়ার লুকোচুরি। মাঝে মাঝে ছায়াগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বাগানে ঢুকতেই সারিবদ্ধ চা গাছ দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না।

বাগানে ঘোরাঘুরি করে ম্যানেজার প্লাবন রায়ের বাংলো বাড়িতে গেলাম। খুব সুন্দর বাংলো। ওখানে আপ্যায়ন করা হলো আমাদের। চা-নাস্তা খেলাম। আপ্যায়ন শেষে আমরা চায়ের ফ্যাক্টরিও দেখলাম। কাঁচা পাতা থেকে কীভাবে চা তৈরি হয় সেই পুরো প্রক্রিয়াটিই স্বচক্ষে দেখলাম।

বাগানে গিয়ে দেখি চা শ্রমিকরা নিরবে-নিভৃতে আপনমনে কাজ করছেন। পাতা তুলছেন কেউ কেউ। পাতা তোলার কাজ মেয়ে শ্রমিকরা বেশি করে থাকে। ওখানে পরিচয় হলো চা শ্রমিক দিপ্তীর সাথে। জানতে পারলাম ১৯ কেজি পাতা তোলার বিপরীতে চা শ্রমিকরা প্রতিদিন মজুরি হিসেবে পান ১২০ টাকা। এরপর বাড়তি তুলতে পারলে নিয়ম অনুযায়ী আরও বেশি টাকা পান।

চা শ্রমিকদের জীবনযাপন নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। তাদের মজুরি বৈষম্য নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, আন্দোলন ধর্মঘটও হয়েছে। চা শ্রমিকরা চা বাগানে এই কাজ ছাড়া আর কিছুই জানে না। বাগানের পাশেই তাদের থাকার ব্যবস্থা আছে। ঘরসংসার, জীবন-জীবিকা তাদের চা বাগান ঘিরেই। দিপ্তীর সাথে কথা বলে আমারও মনে হয়েছে তাদের মজুরি বৈষম্যটা প্রকট। পারিশ্রমিকের তুলনায় ন্যায্য মজুরি তারা পান না। দিপ্তীর সাথে ছবিও তুললাম। সে খুব খুশি হলো। আলাপের একপর্যায়ে বললেন, ‘প্লাবন স্যার আমাকে চেনেন। মোবাইলে তোলা ছবি দেখাবেন স্যারকে। উনি ছবি দেখে খুব খুশি হবেন।’ দিপ্তীর কথা শুনে বললাম, ঠিক আছে। অবশ্যই দেখাবো।

এ কথা শুনে চা শ্রমিক দ্বিপ্তী খুব খুশি হলেন। চা বাগানে দিপ্তীদের মতো অনেক মেয়ে আছে, যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার আরও মনোযোগী হবে বলে আশাবাদী আমি।

ব্যস্ত জীবনে হঠাৎ ঘুরতে বের হওয়া বাড়তি আনন্দই বটে। স্বল্পসময়ে চা বাগান যতটুকু দেখলাম এই আনন্দটুকু অমলিন। অনেক অনেক ধন্যবাদ প্লাবন রায়কে। আতিথেয়তা আর ভালোবাসাটুকু হৃদয়ের মাঝে রাখলাম। সূত্র : চ্যানেল আই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here