জনসংখ্যার ‘সুসময়’ কাজে লাগাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ

0
369

২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। দেশের সব উন্নয়ন সূচক সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ কর্মক্ষম, যা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনবৈজ্ঞানিক মুনাফা হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগই কর্মক্ষম,যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর। এমন পরিস্থিতি একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। প্রশ্ন উঠেছে,এই জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ও সময় মতো সম্পদে রূপান্তর করে, তা থেকে লভ্যাংশ বা সুবিধা নিতে পারবে কি বাংলাদেশ?

আগামী ৩০/৩৫ বছরের মধ্যে এই কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে না লাগাতে পারলে, তা জাতির জন্য বোঝা হয়ে যাবে। তখন দেশে ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ থাকবে বৃদ্ধ। তাদের ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হবে রাষ্ট্রকে। বরাদ্দ বাড়বে স্বাস্থ্য খাত ও বয়স্কভাতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারলে, তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এরমধ্যে পুরুষের সংখ্যা আট কোটি ১০ লাখ এবং নারীর সংখ্যা আট কোটি সাত লাখ ৫০ হাজার। জরিপের তথ্য বলছে, দেশে পাঁচ বছরের ব্যবধানে চার বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ২২ ভাগ। মাতৃ মৃত্যু হারও কমেছে। গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ৬ বছর। সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ। তবে এক থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুমৃত্যুর হার গত তিন বছর ধরে কোনও পরিবর্তন হয়নি। প্রতিহাজারে এই মৃত্যুহার ৯ জনে স্থির রয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৬৮ শতাংশ কর্মক্ষম, যা স্বাধীনতার পর ছিল ৪৪ শতাংশ। গত তিন থেকে চার দশকে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, যারা দেশের বড় সম্পদ। জনসংখ্যার এই চিত্রকে অর্থনীতির ভাষায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যার আধিক্য বা সংখ্যা বেশি। যখন এই কর্মক্ষম জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকে, তখন সেই দেশটি ডেমোগ্রাফিক বোনাস কালে অবস্থান করে। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান এ কে এম নূরুন্নবী বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘২০১০ সালে আমি প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। সেখানে বিষয়টি আলোচনা করেছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড মানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো একটি সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এ ধরনের সুযোগ একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে তা আবার শেষ হয়। এর মধ্যেই এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা অর্জন করতে হবে।’

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে শূণ্য থেকে ১৪ এবং ৬০ থেকে ঊর্ধ্ব বয়সের জনসংখ্যা ছিল ৬৪ শতাংশের বেশি। বাকি ৪৪ শতাংশ ছিল ১৫ থেকে ৬০ শতাংশ। এদের আবার অর্ধেক ছিল নারী। যারা ঘরেই থাকতো, কোনও কাজ করতো না। স্বাধীনতার পরপর দেশে এমন চিত্র ছিল। তার মানে ২০-২২ শতাংশ মানুষ ওই সময় মোট জনসংখ্যাকে সামনে টেনে এনেছে। বাকি ২০ শতাংশ কেবল ভোগ করেছে। এরপর ধীরে ধীরে বয়সের মেয়াদ,শিক্ষা,জনশক্তি রফতানি বেড়েছে, জনসংখ্যাও বেড়েছে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ একটু একটু করে উন্নয়নের পথে হাঁটছে। বর্তমানে দেশে ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৮ শতাংশ। এরা সবাই কর্মদক্ষ মানুষ। তারা কাজ করতে সক্ষম। তবে সবাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছে না।

অধ্যাপক নূরুন্নবী বলেন, ‘আমাদের উৎপাদনকারী বেড়েছে, ভোগকারী বা ভোক্তা কমেছে। এতে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি জানালা খুলে গেল। আমরা জনসংখ্যার মধ্যে একটি বোনাস পেয়েছি। তবে এই ৬৮ শতাংশ কর্মঠ মানুষ মানে এই নয় যে, তারা সবাই উৎপাদনে আছে।  এটা বলা যাবে না। কারণ, এরা সবাই কর্মদক্ষ হলেও সবাই কাজ পাচ্ছে না। তাই এই কর্মদক্ষ জনসংখ্যা অর্থনীতিতে দৃশ্যমান কোনও ভূমিকা রাখছে না। এই মানবগোষ্ঠীকে উৎপাদনে কনভার্ট করতে হবে। এই জনসংখ্যাকে উৎপাদনমুখী করতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যখনই তারা কর্মে প্রবেশ করবে, তখনই জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি সামগ্রিকভাবে এই জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে না পারি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড মানেই সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন না। আমাদের যে জনসংখ্যা কাঠামো সেটা আগে ছিল নির্ভরশীল। এখন সেটা ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীল হবার চেষ্টা করছে।’

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সময়সীমা

এই কর্মদক্ষ জনসংখ্যার বয়সের মেয়াদ থাকে মাত্র ৩০/৩৫ বছর। এই সময়ের মধ্যেই কর্মদক্ষ জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে জন্মহার কমেছে, পাশাপাশি মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে। এটা যেমন খুশির সংবাদ, তেমনই দুঃখের সংবাদও। কারণ, এই কর্মদক্ষ মানুষের হার কমে আসবে, দেশে বাড়বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। যাদের ব্যবস্থাপনা করা রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। তখন অর্থনীতি গতি হারাবে। বিশ্বের বহু দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে পারেনি। ২০৪৬/৪৭ সালে বাংলাদেশে যুবকের তুলনায় বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য এই খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে। বিশ্বের অনেক উন্নত রাষ্ট্রও উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থায় থেকেও এই সমস্যায় ভুগছে। চীন, জাপানসহ অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকদের গড় আয়ু ৮০ বা তার বেশি। ওইসব রাষ্ট্র এখন বৃদ্ধ মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। সেখানে নিম্ন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করা বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের কী অবস্থা হবে, তা  আগে থেকেই অনুমান করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১৭৫২ ডলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মদক্ষ জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে পারলে, মাথাপিছু আয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়বে।

যা এখনও করা হয়নি

দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা। উদাহরণ দিয়ে তারা জানান, দেশের শ্রমবাজারের কোনও সার্ভে করা নেই। কোন পেশার জন্য কত মানুষ প্রয়োজন তা জানা নেই। এটা প্রথমেই করার কথা ছিল।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৭ সালে শ্রমবাজারের সার্ভের জন্য একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা এখনও পাস হয়নি। আমরা জানি না, কোথায় কত মানুষের প্রয়োজন। কর্মক্ষম মানুষকে কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই সার্ভে থাকা প্রয়োজন। আমাদের দেশের পোশাক কারখানার টেকনিক্যাল বড় পদে শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ অন্যান্য দেশের মানুষ কাজ করে। এই খাত থেকে আমরা আয় করলেও অনেক অর্থ বিদেশি কর্মীরা নিয়ে যাচ্ছে। এসব দিক বিবেচনা করে আমাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।’

জনসংখ্যাকে যেভাবে ব্যবহার করে লাভবান হওয়া যাবে

দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেজন্য একটি মহাপরিকল্পনা করা উচিত বলে মনে করেন অধ্যাপক এ কে এম নূরুন্নবী। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মদক্ষতার জন্য কর্মক্ষম মানুষকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে হবে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যে শ্রমবাজার সৃষ্টি করেছি, তা কিন্তু সবসময় টেকসই হবে না। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি যেকোনও সময় মন্দা হতে পারে, তখন তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে পরবে। সেজন্য  নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে হবে। কোন দেশে কী ধরনের শ্রমিক ও মানবসম্পদের প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সেভাবেই প্রশিক্ষিত করতে হবে। আমাদের শ্রমিকরা প্রশিক্ষিত না। তারা অনেক কম বেতনে কাজ করে। এদের প্রশিক্ষিত করে বিশ্বে ছেড়ে দিতে হবে। এছাড়া, নারীরা কাজ করতে চায়, কিন্তু তাদের জন্য সেই পরিবেশটি এখনও সর্বজনীন সৃষ্টি হয়নি। তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।’

কাজে না লাগাতে পারলে মানবসম্পদ হুমকি হবে

যদি এই জনসংখ্যাকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করা যায়, তাহলে এই মানবগোষ্ঠী দেশের জন্য বোঝা হবে। এমনকি তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক নূরুন্নবী। তিনি বলেন, ‘এদের কাজ দিতে হবে। কারণ, এই জনসংখ্যা তাদের খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন চেষ্টা করবে। এমনকি অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হবে না,এই জনসংখ্যাই তখন সেই কাজ করবে।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে, সেটাও কিন্তু একটা ইঙ্গিত দেয়– জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির। তারা কিন্তু কাজের দাবিতে আন্দোলন করেছে। তারা কাজ চায়। যদি এই তরুণদের পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ থাকতো,তাহলে তারা কেউ আন্দোলনে আসতো না।’

এই কর্মক্ষম জনসংখ্যা ও দেশের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিসংখ্যানের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. কৃষ্ণা গায়েন সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে যা করা প্রয়োজন, তা পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হচ্ছে।সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

– বাংলাট্রিবিউন3

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here