দাকোপে দরিদ্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্য-পুষ্টি সুরক্ষায় নিবেদিত ‘নবযাত্রা’

0
35

খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার পানখালি ইউনিয়নের একটি গ্রাম লক্ষীখোলা। আমাদের চিরায়ত গ্রামের মতোই। গাছ-গাছালি, লতাপাতা, পুকুর আর ক্ষেতখামারে মোড়া এক গ্রাম। তবে ভৌগলিক কারণে এবং প্রাকৃতি বিপন্নতায় একটু আলাদা করে চেনা যায়। এরপরেও চারিদিকে কত শোভা! পাখির ওড়াওড়ি, নিমফুলের গন্ধ আর পুকুরে নীলপদ্মের প্রাণছোঁয়া অপরূপতা যেনো জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই।

পশুর নদী ছুঁয়ে এই গ্রামে যেতে হয়। সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা মৃদুমন্দ বাতাস অনুভূত হয় এই গ্রামে হ্নদয় স্পর্শ করলেই। এই গ্রামের চারপাশে মৌখালী, খাটাইল, বারইখালি-আরও কয়েকটি গ্রাম আছে। কিন্তু এই গ্রাম পুঞ্জিতে পা দিয়েই বোঝা সম্ভব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণ-পানি এবং আরও কিছু প্রাকৃতিক অসহায়ত্ব নিয়ে মানুষগুলোকে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে হয়। বিশেষ করে যারা বেশি গরিব বা অতিদরিদ্র মানুষ যেমন- দিনমজুর, ক্ষুদ্রকৃষক, মৎস্য আহরণকারী-এসব মানুষের জীবিকা নির্বাহ আর বেঁচে থাকার মাঝে খোদ প্রকৃতির সাথে নিত্য সংগ্রাম আর লড়াই লুকিয়ে আছে। আসলে প্রকৃতিকে মোকাবিলা এবং জয় করেই এখানে জীবন চলমান।
সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ার কারণে লক্ষীখোলাসহ সব গ্রামেই সুপেয় পানির সংগ্রাম আজীবন। নদী, পুকুর, খাল সব উৎসের পানিই লবণাক্ত। সাধারণ টিউবওয়েলের পানিতেও লবণ। সবখানে আবার ডিপটিউবওয়েল দিয়ে পানি তোলা যায় না। সুপেয় পানির সংগ্রামটা তাই এখানকার মানুষের জীবনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। সুপেয় পানির জন্য এখানে শেষ ভরসা বৃষ্টির পানি। বৃষ্টি এলেই তাই সবাই বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় পানি ধরে রাখেন। সেই সুমিষ্ট পানি তারা পান করেন।

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে লক্ষীখোলা গ্রামের নারী ও শিশুদের অসহায়ত্বটা যেনো আরও প্রকট। স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদেরই বেশি। কিশোরী, তরুণী থেকে বৃদ্ধার বড় অংশ যেনো কোনো কোনো দেখা-অদেখা রোগে আক্রান্ত। তবে সবার শরীরে পুষ্টিহীনতার মাত্রা বেশি লক্ষণীয়। বিশেষ করে দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের একসময় বিপুল সংগ্রাম করতে হয়েছে। চাহিদামাফিক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার না পাওয়ার কারণে বেশিরভাগ মায়েরাই অপুষ্টি সন্তান জন্ম দিতেন। বেশিরভাগ বাচ্চা হতো খর্বাকৃতির। শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিটা ঠিকমতো হতো না। কিন্তু সেই পরিস্থিতি থেকে এখন বের হয়ে আসতে শুরু করেছে লক্ষীখোলাসহ অন্যান্য গ্রাম।

লক্ষীখোলার মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগময় জীবনের বিপরীতে এখানে বছর পাঁচেক আগে আলোকবর্তিকা হয়ে আসে আমেরিকান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি)-এর খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রম-এর অধীনে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ডভিশন এর ‘নবযাত্রা’ নামক প্রকল্প। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম ও উইনরিক ইন্টান্যাশনাল এর সহযোগিতায় কাজ শুরু করে। ‘নবযাত্রা’ প্রকল্প দাকোপ অঞ্চলে সমন্বিতভাবে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে; যাদের মধ্যে ২ বছরের কম বয়সী শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী ও তরুণ-তরুণী অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে তাদের স্বামী, বাবা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ নিয়েও কাজ করছে যারা মূলত: আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের মাধ্যমে মা-শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সর্বোপরি ভাল থাকার জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রকল্পের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে-বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায়ন, নারী-পুরুষের সমতা এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার উদ্দেশ্য। যার বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিশ্চিত করা সম্ভব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহে অবদান রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবর্তন আনয়ন নবযাত্রা প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

এই প্রকল্পের প্রদান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ‘মা ও শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি’ কার্যক্রম। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে-গর্ভবর্তী ও দুগ্ধদানকারী নারীদেরকে শর্তসাপেক্ষে ১৫ মাসের জন্য মাসিক ভাতা প্রদান, মোবাইল ফোন অথবা বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য তথ্যের আদান প্রদান, শিশুর সঠিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ এর জন্য দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুর জন্য অনুপুষ্টি সরবরাহ, বাস্তব সময়ে শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংরক্ষণকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার, মাঠ পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য কর্মীদেরকে মা ও শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি চর্চা বিষয়ক মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান।

একইভাবে নবযাত্রা প্রকল্পের আরেকটি কার্যক্রম হলো-নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যবিধির চর্চা। সংক্ষেপে এটিকে বলা হয় ওয়াশ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো-বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা, স্বাস্থ্যসম্মত নতুন ল্যাট্রিন স্থাপনে সহায়তা এবং বিদ্যমান ল্যাট্রিন এর সংস্কার, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়াটসান কমিটিকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করা, ভোক্তা ও স্যানিটেশন ব্যবসার মধ্যে সংযোগ স্থাপন, সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (এলজিআই) ও ওয়াটসান কমিটির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন।

কৃষি ও জীবিকায়ন কার্যক্রমে বলা হয়েছে-গণনা, সঞ্চয়, ঋণ ও ব্যবসা উদ্যোগ বিষয়ক ‘উদ্যোক্তা সাক্ষরতা’ প্রশিক্ষণ, অতি দরিদ্রদের জন্য প্রশিক্ষণকালীন মাসিক ভাতা, আয়বর্ধণমূলক কার্যক্রমের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষণ শেষে নগদ অনুদান এবং সঞ্চয়ী দল গঠন, বিভিন্ন পর্যায়ের উৎপাদনকারী ও বাজারের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, প্রধান প্রধান কৃষকদের নেতৃত্বে জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি প্রদর্র্শনী খামার স্থাপন। এ ছাড়াও ‘নবযাত্রা’ প্রকল্পের আওতায় আরও রয়েছে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্নাসকরণ, সুশাসন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নারী পুরুষ সমতা কার্যক্রম।

লক্ষীখোলা গ্রামের পাকা রাস্তার পাশে ‘আসলাম শেখে’র বাড়ি। বাড়িটি বিশেষভাবে চিহ্নিত। গ্রামের সব মানুষই জানে রাস্তার পাশে এই বাড়িতে নিয়মিত শিশুর বৃদ্ধি পরিবীক্ষণ কেন্দ্র (জিএমপি), ইপিআই ক্যাম্প বসে। আবার স্বাস্থ্যকর্মীদের নেতৃত্বে উঠান বৈঠক হয়। গর্ভবতী মা, সদ্য মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়, কথাবার্তা হয়। সবার মাঝে জনসচেতনতা তৈরি করা হয়। শিশুদের ওজান মাপা এবং ওজন লিপিবদ্ধ করা হয়। ওজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিলো দরিদ্র গৃহবধূ ফারহানা বেগমের সাথে। ফারহানার বয়স ২৩, এক সন্তানের মা। ফারহানা সন্তান কোলে এসেছেন। হাতে একটা ইপিআই ও গ্রোথ মনিটিরিং ও প্রমোশন (জিএমপি) কার্ড। ফরহানার কোলে কন্যা সন্তান। নাম তাসনিয়া আক্তার মুন্নী। মুন্নীর জন্ম হয়েছে ২০২০ সালের ৩ মে। ফারহানা ‘নবযাত্রা’ প্রকল্পের একজন সদস্য। এই প্রকল্প তাঁকে এক নতুন স্বপ্নের দুয়ারে নিয়ে গেছে। গ্রামের গর্ভবতী হওয়া নিজের মা, খালা, প্রতিবেশীদের তিনি নিজ চোখে খাবার ও পুষ্টির যে সমস্যা দেখেছেন সেই সমস্যায় তাকে পড়তে দেয়নি ‘নবযাত্রা’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের সহায়তায় তিনি পুষ্টি সম্পর্কে যেমন জেনেছেন তেমনি প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতায় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থও দেখিয়েছেন। ফারহানা জানান, যখন তিনি আটমাসের গর্ভবতী তখন থেকে এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিমাসে ২২৪০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পেতে শুরু করেন। প্রতিমাসে বিকাশের মাধ্যমে তিনি এই টাকা পান। বিকাশের যে নাম্বারে তার টাকা আসে সেই সিমটিও দেওয়া হয়েছে প্রকল্প থেকে। প্রাপ্ত এই টাকা দিয়ে তিনি পুষ্টিকর খাবার খান। পুষ্টিকর খাবার কেন খেতে হবে, কীভাবে খেতে হবে তা সবই তিনি ভাল করে জানতে পারেন উঠান বৈঠক থেকে।

সঠিকভাবে এই টাকা খরচের হিসাবটাও দেন ফারহানা। বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে বিকাশের মাধ্যমে যে টাকা পাই সেটা খরচের জন্য একটা ছোট্ট পরিকল্পনা করি। পুরো টাকা প্রতি সপ্তাহের জন্য ভাগ করে ফেলি। আর ওখান থেকে ২০০ টাকা সঞ্চয় করে রাখি। এরপর সপ্তাহের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই টাকা দিয়ে ডিম, মাছ, দুধ, সবুজ ফল এগুলো কিনি। সত্যি কথা কী এই প্রকল্প আমাদের বড় একটা নির্ভরতার প্রকল্প। এই প্রকল্প সহায়তা না পেলে কোনো ধরনের পুষ্টিকর খাবারই আমরা ক্রয় করে খেতে পারতাম না। আমার কোলের বাচ্চার মুখে কোনোদিনই ভালো কোনো পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে পারতাম না। বাচ্চা ও নিজের শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় কাজগুলো সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এখন অনেক কিছু জেনেছি। আর আমরা যা জানি তা অন্যদের সাথে সেগুলো আলাপ করি। যাতে সবাই এখন সচেতন হয়।’ শুধু ফারহানা নন প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলের খুলনার দাকোপ, কয়রা এবং সাতক্ষীরার শামনগর এবং কালিগঞ্জ উপজেলার মোট ৩ হাজার ৬০০ জন নারী এই সহায়তা পাচ্ছেন। এখানে প্রতিকী হিসেবে একজনের গল্প তুলে ধরা হলো। এরকম সবার জীবনেই ‘নবযাত্রা’ নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছে, করেছে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী।

সত্যিই লক্ষীখোলাতে কয়েকবছর আগেও নতুন গর্ভবতী মায়েদের ছিল সীমাহীন অসহায়ত্ব, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ঝুঁকি। আর্থিক সামর্থ না থাকা মলিন মায়াবী মুখগুলো দেখা যেত বাড়িতে বাড়িতে। সেই লক্ষীখোলার সবুজবৃক্ষ আর পাখপাখালির সুমধুর কলতান জানান দেয় এখানে নতুন মায়েরা, অনাগত সন্তানেরা, ছোট্ট শিশুরা এখন সবুজবৃক্ষের মতোই সজীবতা নিয়ে বেঁচে আছে। ‘নবযাত্রা’ তাঁদের জীবনে সঞ্চার করেছে এগিয়ে যাওয়ার নতুন আহবান। এই অমূল্য সম্পদ তাদের জীবনের এক বড় প্রাপ্তি। সূত্র : চ্যানেলে আই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here