নকল থিসিসেই বিশ্ববিদ্যালয় পার!

0
724

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে হলে শিক্ষার্থীদের সাধারণ কোর্সের পাশাপাশি বিভিন্ন বর্ষে টার্ম পেপার, থিসিস-মনোগ্রাফ, মাঠকর্ম জমা দিতে হয়। এ জন্য নির্দিষ্ট নম্বরও বরাদ্দ থাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই গবেষণা প্রবন্ধগুলো নীলক্ষেত থেকে সস্তায় কিনে তার ওপরে কেবল নিজের নামটি বসিয়েই জমা দেন শিক্ষার্থীরা। এসব গবেষণাপত্র মৌলিক কিনা তা যাচাই না করেই শিক্ষকরাও সেগুলোতে নম্বর দেন। আর এভাবেই নকল থিসিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে যান শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা নিজেরাই রেডিমেড থিসিস জমা দিতে শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করেন। এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, ‘এমন কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সৃষ্টিশীলতাকে নিরুৎসাহিত করছে।’ এ মাসের শুরুর দিকে নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটে সরেজমিন দেখা গেছে, ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকানগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণাপত্র সংগ্রহে রাখা আছে। কোনও কোনও দোকানের সামনে লেখাও রয়েছে, ‘এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস, মনোগ্রাফ, মাঠকর্ম তৈরি ও প্রিন্ট করা হয়’। এসব গবেষণাপত্র মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রবন্ধ জমা দেওয়ার সময় এলে নীলক্ষেতের অলিগলিতে রীতিমতো ভিড় লেগে যায়। আর এই সুযোগে মোটা অংকের ব্যবসা করেন নীলক্ষেতের দোকানিরা। বাকুশাহ মার্কেটের একটি দোকানের সামনে টার্ম পেপার, থিসিস, মাঠকর্ম বিক্রির বিজ্ঞাপনকয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব টার্ম পেপার, থিসিস ও মনোগ্রাফ নীলক্ষেত থেকে নিয়ে যান। প্রসঙ্গত, উল্লিখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ, আইন অনুষদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদের বেশিরভাগ বিভাগের শিক্ষার্থীকে টার্ম পেপার, থিসিস, মনোগ্রাফ ও মাঠকর্ম কাজ করতে হয়। সরেজমিন দেখা যায়, নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটের এ ব্লকের এক নম্বর গলির ৭/১ নম্বর ‘মা কম্পিউটার’ নামে দোকানের কর্মীকে দুই শিক্ষার্থী বুঝিয়ে দিচ্ছেন টার্ম পেপারের নামের স্থানে কী নাম বসবে। দোকানদার তাদের নাম বসিয়ে হুবহু দুটি টার্ম পেপার প্রিন্ট করলেন। প্রিন্টের পরে সেটা যাবে বাঁধাইয়ে। তার আগে পরিচয় গোপন রেখে ওই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টার্ম পেপারের কয়েকটি পৃষ্ঠার ছবি তোলেন বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদক। এই নকল টার্ম পেপার থেকেই নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা দুজন ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। একই টপিক ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ’ শীর্ষক টার্ম পেপার জমা দেবেন তারা। তাদের সুপারভাইজার ঢাকা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দিললুর রহমান। এই দুই শিক্ষার্থীর টার্ম পেপার জমা দেওয়ার তারিখ ছিল গত ৩ সেপ্টেম্বর। এ ধরনের নকল থিসিস জমা দিলে নম্বর পাওয়া যাবে? জানতে চাওয়া হলে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এর আগেও তো আমরা এভাবেই জমা দিয়েছি। কোনও সমস্যা নেই।’ মুখে ভেংচি দিয়ে একজন বলেন, ‘স্যারেরা ওসব দেখেন না। খালি প্রথম পৃষ্ঠায় তার (স্যারের) নিজের নাম আছে কিনা, সেটা দেখেই নম্বর বসিয়ে ছেড়ে দেন। আমাদের বড় ভাইয়েরাও একইভাবে পাস করে গেছে।’ নীলক্ষেতের দোকানে থিসিস-টার্ম পেপারের লিস্ট ও বাঁধাই করা স্যাম্পল এই শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধায়ক সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দিললুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনিও বিষয়টি স্বীকার করেন। ড. দিললুর বলেন, ‘আসলে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ক্লাস করে না, বহুদিন পর এসে শুধু পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার আগে ৫০ মার্কের টার্ম পেপার জমা দেয়। আমরা তো তাদের ফেল করিয়ে দিতে পারি না। তবে শুধু ভাইভায় শিক্ষার্থীর কাছে টার্ম পেপারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়—সে যে বিষয়ে কাজ করেছে, সেটা সে বোঝে কিনা। যদি দেখা যায় সে উত্তর দিতে পারছে, তখন ধরে নেওয়া হয় সে বোঝে। আমরা এটুকুই সর্বোচ্চ দেখি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া নীলক্ষেত থেকে না কোথা থেকে কপি করে আনলো, সেগুলো তো আমরা চেক করতে পারি না। শুধু দেখা হয় বিষয়বস্তু ঠিক আছে কিনা। আর সে ওই বিষয়ে জানে কিনা।’ শিক্ষার্থীদের জমা দেওয়া নকল টার্ম পেপারেই দিব্যি নম্বর দিচ্ছেন শিক্ষকরা, এটা কী করে সম্ভব? এ প্রশ্নে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন মোল্লাহ বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ’অন্য কোথাও এমনটা হয় কিনা জানি না, কিন্তু অন্তত ঢাকা কলেজে এমনটা হওয়ার কথা না। কারণ, আমাদের শিক্ষকরা এগুলো খুব ভালো করে চেক করেন। তারপরও কেউ যদি এমনটা করে থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ‘মা কম্পিউটার’-এর এক কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমার কাছে প্রায় চার হাজার থিসিসের কপি আছে।’ থিসিসের শিরোনামের লিস্টসহ বাঁধাই করা একটি মোটা বই ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে শিরোনামের থিসিসটি আপনার দরকার, শুধু সেটা দেখিয়ে দেবেন। আপনার নাম বসিয়ে প্রিন্ট করে দেবো।’ সাইনবোর্ড সম্বলিত বাকুশাহ মার্কেটের বি ব্লকের ২ নম্বর গলির ৯৭ নম্বর দোকানটির নাম ‘মুন ফটোকপি’। এখানেও তৈরি হয় থিসিস ও টার্ম পেপার। নিজের নাম গোপন রেখে দোকানের এক কর্মচারী বলেন, ‘এখানে শুধু আমাদের দোকানেই নয়, আরও অনেক দোকানে থিসিস-মনোগ্রাফ ও টার্ম পেপার পাওয়া যায়। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই বেশি আসে।’ এগুলো দিয়ে তাদের কাজ হয় কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কাজ না হলে কি তারা নেয়?’ এত থিসিস কীভাবে সংগ্রহ করেন, জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে অস্বীকার করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন নীলক্ষেতের কম্পিউটারের দোকানগুলোতে টাইপ ও বাঁধাইয়ের কাজ করাতে আসেন, তখন দোকানদাররা সেগুলোর কপি তাদের কম্পিউটারে রেখে দেন। এগুলোই পরে চাহিদা অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন তারা। থিসিস ও টার্ম পেপারের জন্য নীলক্ষেতের একটি দোকানে ইডেন কলেজের কয়েক ছাত্রীইডেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীকেও দেখা গেল কয়েকটি ফটোকপির দোকানে ভিড় করেছেন। তাদের অনেকের হাতে রয়েছে হুবহু একই রকমের থিসিস পেপার। এই শিক্ষার্থীরা জানান, তারা সবাই প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। থিসিস হুবহু কপি করলেও কোনও সমস্যা হয় না বলে দাবি করেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন কলেজের মার্কেটিং বিভাগের মাস্টার্সের এক পরীক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে অভিযোগ করে বলেন, ‘শিক্ষকরা মাথা খাটানোর ভয়ে নীলক্ষেত থেকে থিসিসের কপি সংগ্রহ করতে আকার-ইঙ্গিতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন। সেক্ষেত্রে আমাদের কী করার আছে? অথচ তারা চাইলেই আমাদের একটু গবেষণা শেখাতে পারেন। শিক্ষকরা একটু দায়িত্বশীল হলেই আমরা গবেষণা শিখতে পারতাম। মৌলিক গবেষণা আমাদের ভবিষ্যতের জন্যেও কাজে লাগতো। কিন্তু এটা হয় না।’ বিভাগের কোন কোন শিক্ষক এ কাজে জড়িত, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি ইডেন কলেজের এই শিক্ষার্থী। তবে তিনি বলেন, ‘বিভাগের দুই-একজন বাদে বাকি সবাই একই কাজ করেন। এছাড়া, এদের কেউ কেউ চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।’ ইডেন কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে বিভাগে শিক্ষকের সংখ্যা ও জনবল খুবই কম। এত বেশি শিক্ষার্থীর থিসিস, টার্ম পেপার খুব বেশি যাচাই-বাছাই করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া, এক- একজন শিক্ষকের সঙ্গে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর একটি করে গ্রুপ তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে অনেক সময় নকল থিসিস জমা দিয়ে এই সুযোগটি কোনও কোনও শিক্ষার্থী নিতেও পারে। তবে আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করি যাতে নকল থিসিস জমা দিয়ে কেউ পার না পায়।’ নীলক্ষেত থেকে থিসিস সংগ্রহে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করেন শিক্ষকরাই, এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন অধ্যাপক আব্দুল কাদের। বাজারে থিসিস বেচাকেনা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষা বর্তমানে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, সার্টিফিকেট, টার্ম পেপার, মাঠকর্ম, থিসিস-মনোগ্রাফও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।’ এ ধরনের রেডিমেড থিসিস-মনোগ্রাফ শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সৃষ্টিশীলতাকে নিরুৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘নকল থিসিস জমা দিয়ে কেউ যেন নম্বর নিয়ে যেতে না পারে, সেটা একমাত্র প্রতিরোধ করতে পারেন শিক্ষকরাই। ফলে শিক্ষকদের ইন্ধন ছাড়া কোনও শিক্ষার্থী এভাবে পার পেয়ে যেতে পারে না। ফলে এর পেছনে শিক্ষকরাই বেশি দায়ী।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here