নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই-সুজন

0
259

সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনের তথ্য সামনে এনে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলছে, নির্বাচন কমিশন সরকারের বার্তাতেই কাজ করছে। সরকারের বার্তা  পেয়ে যে প্রশাসন দিয়ে রংপুরে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছিল ইসি একই প্রশাসন নিয়ে খুলনা ও গাজীপুরে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে প্রমাণ হয় সরকার যে বার্তা দেয় সে অনুযায়ী কমিশন কাজ করে। রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব মন্তব্য করা হয়।

তিনি সিটি নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনের কমিশনের নির্দেশনা সত্ত্বেও ফাঁক-ফোকর গলিয়ে উঠেছে গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ।  নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে থেকে থেকেই রাজশাহীতে মামলা দেয়া শুরু হয়েছে। আর এখন সিলেটে মামলা ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বরিশালে নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনাগুলো একদিকে যেমন ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, পাশাপাশি তারা অনেক ধরনের সন্দেহের দোলাচলে রয়েছেন। সাধারণ ভোটাদের মধ্যে একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তারা কী-আদৌ সুষ্ঠুভাবে তাদের নাগরিক অধিকার ভোট প্রদান করতে পারবে কি-না?

গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজনের সভাপতি এম. হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ৩ টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে আমাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। শঙ্কার পাশাপাশি রয়েছে হতাশাও। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুরের পর নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের যে আস্থা তৈরি হয়েছিল তা কমিশন ধরে রাখতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনকে বিবেচনায় রাখতে হবে কয়েক মাস পর জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ৩ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হচ্ছে বড় নির্বাচন। সঙ্গত কারণেই সারা দেশের মানুষের নজর থাকবে এই নির্বাচনের দিকে। এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে জনগণের কাছে একাদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা  দেবে। অপরদিকে এই নির্বাচন যদি খুলনা ও গাজীপুরের মতো প্রশ্নবিদ্ধ হয় তবে তা নেতিবাচক বার্তা দিবে।
তিনি আরও বলেন, ৩ টি এলাকায় আমাদের প্রতিনিধিরা সরজমিন গেছেন। সেখানকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়াও গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা নানা তথ্য পাচ্ছি। ৩ সিটি করপোরেশন এলাকায় সরকারি দলের প্রার্থী বাদে যারা বিরোধী দলের বা  হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন তাদের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় করা হচ্ছে। অনেকের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। নির্বাচনে প্রার্থীর নেতাকর্মীরা হয়রানির শিকার হলে স্বাভাবিকভাবে অন্য নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠে তাদের নেতাদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাতে ভয় পায়। ইতিমধ্যেই একজন সিটি মেয়র ও কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আচরণবিধি ভঙ্গ করে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে দেখা গেছে। একটি সিটিতে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারণা করতে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষসহ আরও অনেকেই। এমন অনেক প্রার্থী আছেন যারা নির্বাচনে ২ লাখ ভোট পেয়েছেন। কিন্তু, অনেক কেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। তারা আগে থেকেই সেখানে তাদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছেন। এসব কারণে আমাদের সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকা দরকার। কিন্তু, সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজনের কেন্দ্রীয় সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ৩ সিটির নির্বাচন পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে মাগুরা ও খুলনার মতো মডেল ইলেকশন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে যদি ‘ভয়’ শব্দটা থাকে তাহলে প্রার্থীরা নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারেন না। এটি নির্বাচন কমিশনকে যথাযথভাবে আমলে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে যদি প্রভাবশালীরা আগ্রাসি নীতি অবলম্বন করেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এমনিতেই নানা শঙ্কার মধ্যে পড়বেন। তখন তাদের কাছে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। সিলেটে সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে একজন ছাড়া কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর  দাঁড়াতে পারেনি। দেশের জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন একটি বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা উচিত। এই চর্চা রয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতে। ১ টি বছরের মধ্যে নির্বাচন হয়ে  গেলে জাতিকে নির্বাচন নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। অনুষ্ঠানে ৩ সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দীলিপ কুমার সরকার বলেন, সিলেট সিটি করপোশনে মেয়র পদে ৯ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১২৭ জন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ১ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর, ২ জন স্নাতক, ১ জন এইচএসসি, ১ জন এসএসসি এবং ২ জন স্বশিক্ষিত। আর সিলেটে ৭ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৪ জনের ফৌজদারি মামলার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোশনে মেয়র পদে ৫ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৫২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ৫ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ২ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর ও ৩ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৫ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনের ফৌজদারি মামলার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অপরদিকে, বরিশাল সিটি করপোশনে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৯৫ জন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনে ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ১ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর ৪ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ১ জন এসএসসি ও ১ জন স্বশিক্ষিত। বরিশালে ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ফৌজদারি মামলায় সংশ্লিষ্টতা রয়েছে ৩ জনের। লিখিত বক্তব্যে আগের সিটি নির্বাচনগুলোর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, রংপুরে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। এখানে সরকারের বার্তা ছিল সুষ্ঠু ভোট করার। পরে গাজীপুর ও খুলনায় ভোটে জাল ভোট, কেন্দ্র দখলসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অনিয়মের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। সরকারের বার্তা না থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এসব অনিয়মে জড়াবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here