নারী উদ্যোক্তা দেলোয়ারা বেগমের সফলতার গল্প

0
1019
নারী উদ্যোক্তা দেলোয়ারা বেগমের সফলতার গল্প
শওকত জামান

সংসারের কাজের ফাঁকে শখের বশে ব্লক বুটিকের কাজ করতেন দেলোয়ারা বেগম। নিজ বাড়ীতেই ব্লক বুটিক শেখার প্রশিক্ষন দেন আশপাশের নারীদের। শৈল্পিক এ কাজের নেশা কখন যে পেশায় পরিনত হয়েছে বুঝতেই পারেননি তিনি। ব্লক বুটিকের সাথে যোগ হয় হস্ত শিল্পের।  আজ হস্তশিল্পের সফল উদ্যোক্তা তিনি। মিলেছে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি।

এই সফল নারী উদ্যোক্তার বাড়ি শহরের বকুলতলা এলাকায় মাদ্রাসা রোডের দীপ্ত কুটিরে। সেখানে দেলোয়ারা বেগম বাংলাদেশ জার্নালের সাথে আলাপচারিতায় তার সফলতার গল্প বলেন। তিনি জন্ম নিয়েছেন ময়মনসিংহ শহরের কাচিঁঝুলি এলাকায় হামিদ উদ্দিন রোডে। সেখানেই বেড়ে উঠা। বৈবাহিক সুত্রে জামালপুরে আসা। বিয়ে হয়েছে জামালপুর সদর উপজেলার নিভৃত পল্লী হাজিপুর গ্রামে নিজাম উদ্দিনের সাথে। তার বর্তমান বয়স ৪২।

২০০১ সালে সন্তানদের ভাল স্কুলে লেখাপড়া করানোর জন্য জামালপুর শহরে বাসা ভাড়া নেন। দুই ছেলে স্বামী নিয়ে ৪ জনের ছোট্র সংসার। বড় ছেলে শাকির উদ্দিন দীপ্ত ব্র্যাক ইউনির্ভাসিটিতে বিবিএতে ও ছোটছেলে ফয়সাল মাহমুদ সুপ্ত নর্থসাউথ ইউনির্ভাসিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছে। আগে থেকেই শৈল্পিক কাজের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল তার। বাড়ীতে সংসারের কাজের ফাঁকে ব্লক বুটিকের কাজ করতেন এবং আশপাশের নারীদের শিখাতেন। শখের বশে এ কাজ চলে ২০০৪ সাল পর্যন্ত।

হস্তশিল্প বিশেষ করে সুঁচি শিল্পের জন্য বিখ্যাত জামালপুর শহর। তার মাথায় আসে সুচিঁ শিল্পের এই শহরে বানিজ্যিক ভিত্তিতে ব্লক বুটিকের পাশাপাশি হস্ত শিল্পের কাজ শুরু করলে কেমন হয় ? যেই চিন্তা সেই কাজ। মাত্র ৫ হাজার টাকা পুজিঁ হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। শুরু করেন ব্যবসা। গড়ে তুলে দীপ্ত কুটির নামে হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান। কঠোর পরিশ্রমে দিনকে দিন তার ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে দেখা দেয় পুজিঁ সংকট। তবে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্ষুদ্র ঋণ নেন বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে। সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে দেলোয়ারার হস্তশিল্পের ব্যবসা।

২০০৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক এসএমই ঋণ চালু করলে আবেদন করেন তিনি। ৫ লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। ব্যবসা করে ২ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১১ সালে ১৫ লাখ পর্যায়ক্রমে ৫০ লাখ সবশেষে ৭০ লাখ টাকা ঋণ দেয় তাকে। বিশাল অংকে পুজিঁ খাটানোয় তরতর করে বেড়ে উঠে হস্তশিল্পের ব্যবসাটি। বর্তমানে দীপ্ত কুটিরের কারখানায় ৩৫ জন ও মাঠ পর্যায়ে দুই শতাধিক কর্মী নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারা সুইঁ সুতোর কারুকাজ খচিত নানা বাহারি ডিজাইনের হস্তশিল্পের পণ্য তৈরী করছে। থ্রিপিছ,পাঞ্জাবী,নকশীকাঁথা,বেডশিট,কুশনকভার,শাড়ী,বিভিন্ন আইটেমের ব্যাগ ও হাতপাখাসহ নানা হস্তজাত পণ্য। মানসম্পন্ন দীপ্ত হস্ত শিল্পের পণ্য জেলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সুনাম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতা আসতে থাকে।

ঢাকায় এসএমই মেলা,যুব মেলা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলায় অংশ নেয়। ২০১২ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নারী কোটায় শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তার জাতীয় পুরস্কার গ্রহন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। একই বছর শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মী হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার, বর্ষসেরা ক্ষুদ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা-২০১২ নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন মেলায় অংশ নিয়ে ২০১৩ সালে তৃনমুল নারী উদ্যোক্তা সংগঠন থেকে উদ্যোগ ও উদ্যেক্তা ক্যাটাগরিতে সন্মাননা, মানবাধিকার সন্মাননা পদক-২০১৩, সফল নারী উদ্যোক্তার পদক,২০১৬ সালে ময়মনসিংহে এসএমই পন্য মেলায় প্রথম, ২০১৭ সালে জাতীয় এসএমই পণ্যমেলা-২০১৭ এ দ্বিতীয় পুরস্কার পান।

এক পর্যায়ে দীপ্ত কুটিরের হস্তশিল্পের পন্য পরিচিতি লাভ করে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে । বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যুরোর মাধ্যমে নেপাল, চীন এবং ভারতের দিল্লি, কোলকাতা ও শিলিগুড়িসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হস্তশিল্পের মেলাগুলোতে অংশ নিয়েছেন। সুযোগ পেলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মেলা করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

জামালপুর জেলা হস্তশিল্প মালিক সমিতির সহ-সভানেত্রী দেলোয়ারা বেগম বাংলাদেশ জার্নালকে আরো জানিয়েছেন, শহরের প্রানকেন্দ্র তমালতলা মোড়ে ৪ শতাংশ জমির উপর দীপ্ত কুটিরের ৫ তলা নিজস্ব ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। তিনি অসহায় নারীদের পুণর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য শহরের মুকুন্দ বাড়ী এলাকায় ১২ শতাংশ জমি কিনেছেন।

বেকার নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নিজেকে অসহায় না ভেবে হাতটি কর্মক্ষম করে অটুট লক্ষ্যর দিকে এগিয়ে যান সাফল্য আসবেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here