প্রথম কোরবানি যিনি করেছিলেন

0
35

কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। আরবি ভাষায় এটি ‘উজহিয়্যাহ’ নামে পরিচিত। শাব্দিক অর্থে কুরবানি বলা হয়, যে পশু জবাই করা হয়। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের জন্য কোরবারিন দিন বা পরের তিন দিনের কোনো একদিন পশু জবাই করাকে ‘উজহিয়্যাহ’ বা কোরবানি বলা হয়। (মুজামু মাকায়িসুল লুগাহ, পৃষ্ঠা : ৩৯১/৩)

কোরবানি তাৎপর্য : মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা করা ও নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত থেকে পশু কোরবানির সূচনা হয়। শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের আগে যুগে যুগে সব শরিয়তে কুরবানির বিধান চালু ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি সব জাতির জন্য কুরবানির বিধান রেখেছি, যেন আমি তাদের জীবনোকরণ হিসেবে যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি তাতে (জবাই করার সময়) আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সুরা হজ, আয়াত : ৩২)

সামর্থ্যবান ব্যক্তির শর্তসাপেক্ষে কুরবানি করা ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা : কাউসার, আয়াত : ২)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কুরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ২১২৩, মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ৮২৭৩)

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি : মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানি করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লহর কাছে (কুরবানির পশুর) মাংস, রক্ত পৌঁছে না, বরং আল্লাহর কাছে তোমাদের তাকওয়াত (তথা একনিষ্ঠভাবে সম্পন্ন আমল) পৌঁছে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩৭)

কোরবানির সওয়াব : জায়েদ বিন আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.)-এর সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, এই কুরবানি কি? তিনি বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাত। ফের তাঁরা জিজ্ঞেস করল, এতে কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে একটি সওয়াব হবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, ভেড়ার পশমের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য? তিনি বললেন, ভেড়ার প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে একটি সওয়াব লিখা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ২৬০)

প্রথম যিনি কোরবানি করেছেন : সর্বপ্রথম আদম (আ.)-এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল কুরবানি শুরু করেছেন। পবিত্র কোরআনে তাদের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তারা একটি বিরোধ মীমাংসার জন্য কুরবানি করেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আদম (আ.)-এর দুই পুত্রের ঘটনা তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করেছিল, তখন একজনের কুরবানি কবুল করা হয় এবং অন্যজনের কবুল হয়নি।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২৭)

দুই ভাইয়ের মধ্যে হাবিলের কুরবানি কবুল হয়। যার কুরবানি কবুল হয়নি সে অন্যজনকে হত্যার হুমকি দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি আমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়ালেও আমি তোমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়াব না, আমি উভয় জগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করো এবং জাহান্নামের অধিবাসী হও, এটা অত্যাচারীদের কর্মফল। অতঃপর তার ভাইকে হত্যা করতে উত্তেজিত হয়, অতঃপর সে তাকে হত্যা করে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২৮)

ভাইয়ের মরদেহ দাফনের শিক্ষা : ভাইকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ নিয়ে অপর ভাই দুশিন্তায় পড়েন। এমন আল্লাহ একটি কাক পাঠিয়ে মরদেহ দাফনের শিক্ষা দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আল্লাক একটি কাক পাঠান, যে তাই ভাইয়ের মৃতদেহ কীভাবে গোপন করতে হয় তা দেখানোর জন্য মাটি খনন শুরু করে, ওই ভাই বলল, হায় আমি কি এই কাকের মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমি নিজের ভাইয়ের মৃতদেহ গোপন করতে পারি! অতঃপর সে অনুতপ্ত হলো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩১)

ইবরাহিম (আ.)-এর প্রিয় বস্তু কোরবানি : মূলত আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসরণ করে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে কুরাবানির নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নযোগে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর জন্য কুরবানির নির্দেশ দেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তিনি সন্তানকে কুরবানি করতে পুরোপুরি প্রস্তুতি নেন। এমন সময় মহান আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-এর বদলে পশু কুরবানির নির্দেশ দেন। মুমিনরাও যেন নিজেদের প্রাণ ও প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর জন্য সপে দিতে সদা প্রস্তুত থাকে এটাই কুরবানির প্রধান শিক্ষা।

কোরআনের বর্ণনায় পিতা-পুত্রের ঘটনা : আল্লাহর জন্য পিতা ও পুত্রের উৎসর্গের পুরো ঘটনার বর্ণনা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি [ইবরাহিম (আ.)] বলেন, হে আমার রব, আমাকে একজন সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে একজন বুদ্ধিমান পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।

অতঃপর সে [ইসমাইল (আ.)] যখন কাজের বয়সে উপনীত হয়, তখন ইবরাহিম বলল, হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখি যে তোমাকে আমি জবাই করছি, এখন তোমার মত কি বলো, সে বলল, হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং তিনি [ইবরাহিম (আ.)] পুত্রকে জবাইয়ের জন্য কাত করেন। তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম। আপনি স্বপ্নের আদেশ পালন করেছেন। আমি এইভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরষ্কৃত করে থাকি।

নিশ্চয় তা ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে একটি (কুরবানির) জন্তুর মাধ্যমে মুক্ত করি। আমি তা পরবর্তীদের জন্য বিধান হিসেবে রেখেছি।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০০-১০৮)। লেখক: মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ, সূত্র: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here