বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস

0
800

গণমাধ্যম ডেস্কঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিন্তা করেছিলেন জ্বালানির মতো স্ট্রাটেজিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রাখা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ৫টি বেসরকারি গ্যাসক্ষেত্রকে সরকারিকরণ করেন। জ্বালানির ক্ষেত্রে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করেছিলেন তিনি। তিনি ভেবেছিলেন জ্বালানির ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃত্ব বজায় রেখে প্রয়োজন অনুসারে বিদেশি কোম্পানিকে নিয়োগ করে এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো একটা অনুন্নত দেশ ধীরে ধীরে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

১৯৭৩ সালে সারাবিশ্বে তেল সংকট দেখা দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নতুন তেল-গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য অনেক বিদেশি কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে এসব প্রস্তাব বিবেচনা বা মূল্যায়নের কোনো আইনি ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। কিন্তু দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩-৭৫ সময়কালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দুটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটান।

১. একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। আজকের পেট্রোবাংলা ও ১৯৭৪-এর পেট্রোলিয়াম আইন এ থেকেই জন্মলাভ করে; ২. সে সময় পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে ব্রিটিশ শেল কোম্পানির মালিকানায় পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রজ্ঞা/কূটনীতি খাটিয়ে অল্প মূল্যে কিস্তিতে এ পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসেন ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সাল থেকে ৯ আগস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালন করছে। জ্বালানি খাতে বঙ্গবন্ধুর স্বল্পসময়ের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।

বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান একটা কেবিনেট কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি এশিয়ার নানা দেশের পেট্রোলিয়াম আইনকানুন স্টাডি করে; বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে ‘প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)’-এর আলোকে ছয়টি প্রস্তাব বাছাই করলে সরকার তা অনুমোদন করে। এরই মধ্যে পাস হওয়া ১৯৭৪-এর পেট্রোলিয়াম আইনের আলোকে সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ছয়টি পিএসসি স্বাক্ষর করা হয়। আজকের প্রেক্ষাপটে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, ওই সময়ে বাংলাদেশকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ১৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়। স্থলভাগে ১০টি ও সাগরবক্ষে ছয়টি ব্লক চিহ্নিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোকে শুধু সাগরবক্ষে কাজের জন্য নিয়োগ করেছে। এ কাজে যিনি তার সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি হলেন সে সময়ের আইনমন্ত্রী ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। তিনি তার ’ল অ্যান্ড পলিসি ইন পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ১৯৭৪-এর আইনের একটা মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায় সরকারের একচ্ছত্র উদ্যোগে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ উত্তোলিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানিকে ‘কন্ট্রাক্টর’ হিসেবে যথাযথ চুক্তির অধীনে নিয়োগ করবে। এ কাজের জন্য দক্ষ জনবল নিয়ে ও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিয়ে পেট্রোবাংলা তৈরি করা হয়, যার প্রধান সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে তৎকালীন শেল কোম্পানি থেকে দেশের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র (তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাসটিলা, বাখরাবাদ) অল্প মূল্যে কিনে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনার ব্যবস্থা করেন। সেগুলো থেকে বর্তমানে সুলভে মোট চাহিদার বিশাল অংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু অসাধারণ বিচক্ষণ ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় জ্বালানি খাতের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করার মানসে এ পদক্ষেপ নেন। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ (৬০ শতাংশ) আসে বিদেশি মালিকানার গ্যাসক্ষেত্র থেকে।

কয়েকবছর আগে এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্যই পেট্রোলিয়াম আইন ও পেট্রোবাংলা তৈরি হয়েছে। অথচ আজ এর ভগ্নদশা দেখা যায়, যা সরকারি কর্মকর্তারা সবসময়ই বলে থাকেন; এ খাতে বিদেশী কোম্পানি নিয়োগ করার কথা উঠলেই যুক্তি দেখানো হয় যে, পেট্রোবাংলা তথা বাপেক্সের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাধ্য-সামর্থ্য কিছুই নেই। যে লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এটি দাঁড় করিয়েছেন, সেই মাপে কেন এটি তৈরি হয়নি? জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালন করে বঙ্গবন্ধুর কর্ম স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নটিও তোলা উচিত।

জ্বালানি ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও চিন্তার প্রতিফলন না ঘটলে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নতি কখনো হবে বলে আশা করা অনর্থক। শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা থেকে সরে আসার ফলেই বিদেশি কোম্পানিগুলো আজ বাংলাদেশের গ্যাস খাতের প্রায় ৬০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।

১৯৯৭ সালের মাগুরছড়া অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কয়েকজন নাগরিক হাই কোর্টে স্থলভাগে বিদেশি কোম্পানি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য রিট পিটিশন দাখিল করলে আদালত তা সাময়িক মঞ্জুর করেন। এটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ড. কামাল হোসেনকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করে ২০০৯-এর শেষের দিকে এর বিরুদ্ধে আপিল করেন। আদালত ড. হোসেনের তীক্ষ যুক্তি মেনে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং পিটিশন খারিজ করে দেন ২০১০-এর ২৮ জানুয়ারি। ওই মামলায় ড. হোসেন উল্লেখ করেন যে, স্থলভাগে বিদেশি কোম্পানির নিয়োগ-সংক্রান্ত সরকারের নানা সিদ্ধান্ত এ-সংক্রান্ত আইন ও নীতির বাইরে যায়নি এবং এক্ষেত্রে আদালত কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।

জ্বালানি খাতে বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপ এ খাতকে সমৃদ্ধ করেছে। তার ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি জ্বালানি খাতে গতানুগতিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির উপর নজর রেখে পদক্ষেপ নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন।

আজ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস। দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here