মরীচিকা—রিভিউ

0
29

রাজিয়া সুলতানা জেনি: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি তে রিলিজ হয়েছে শিহাব শাহিন পরিচালিত ‘মরীচিকা’। বেশ নামী দামী স্টার কাস্ট নিয়ে তৈরি এই ওয়েব সিরিজে প্রথমবারের মত একসাথে হয়েছিলেন মাহিয়া মাহি, সিয়াম, জোহান এবং নিশো। ফলে এর প্রতি কমবেশি সবারই আগ্রহ ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি সিরিজ ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রিলিজ হয়। বেশ ভালোই আলোচনায় আসে। বিশেষ করে সেগুলো ভারতীয় বাংলা সিরিজের চেয়ে মানে উন্নত হওয়ায় বেশ প্রশংসিতও হয়। সেই কারণেই শিহাব শাহিনের এই সিরিজটা নিয়েও ছিল প্রত্যাশা এবং অপেক্ষা।
থ্রিলার ধর্মী হলেও কাহিনী খুব কমন। মডেল হতে চাওয়া এক মেয়ের জীবন কাহিনী। ওপরে ওঠার জন্য যে পথ সে বেছে নেয় তা তাকে কোথায় নিয়ে যায়, সেই গল্পই হচ্ছে ‘মরীচিকা’ শুরুটা হয় একটা লাশ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। পুকুর বা নদীতে ফেলে দেয়া লাশ আবিষ্কারের যে দুটো কমন ফর্মুলা আছে তার একটা হচ্ছে জালে আটকানো অন্যটা হচ্ছে ভেসে ওঠা। এখানে নতুন ফর্মুলা হাজির করা হয়েছে, দেখানো হয়েছে নৌকার সাথে আটকে গেছে।
এরপরে যেমনটা হয়, পুলিশি তৎপরতা। এবং এক সময় শনাক্ত হওয়া। সেটাও নিয়ম মেনেই হয়েছে। এখানে কিছুটা ইন্ট্রা পুলিশ রাইভালরি দেখানো হয়েছে। এরপরে ধীরে ধীরে কাহিনী এগিয়ে গেলে দেখা যায় লাশটি এক বিখ্যাত মডেলের। আরও এগিয়ে গেলে দেখা যায় খুনি হিসেবে পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহ মডেলের স্বামীকে। কিন্তু স্বামীটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে সে জানায়, আসল খুনি বাবু ভাই নামক একজন ছাত্রনেতা কাম রাজনীতিবিদ।
মার্ডার থ্রিলার বলতে যা বোঝায়, শেষ মুহূর্তে আবিষ্কার হবে কে খুনি, এখানে তেমন কিছু ঘটেনি। প্রথম কয়েক পর্বে সন্দেহ থাকলেও দর্শকরা অনেকটাই পরিষ্কার বুঝতে পারেন, কে খুনি। তারপরও, এভিডেন্স খোঁজা, আই উইটনেস যোগাড়, এসব নিয়ে কাহিনী লম্বা করার চেষ্টা চলেছে। কাহিনীকার আবার প্রোটাগনিস্ট নারী চরিত্রটির স্খলন এবং ফাঁদে পড়া ব্যাপারটাকে হাইলাইট করতে চেয়েছিলেন। সেই সাথে হাইলাইট করতে চেয়েছিলেন, পলিটিশিয়ান, ক্রিমিন্যাল নেক্সাস ব্যাপারটাকে। বাগানবাড়িতে চলা প্রস্টিটিউশান র‍্যাকেট কিংবা ড্রাগের আস্তানাও দেখিয়ে ফেলেন এক ফাঁকে। আর পুলিশ যেহেতু আছে, দুর্নীতিবাজ পুলিশের মাঝেও তাই হাইলাইট করেছেন এই কেস ক্র্যাক করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টারত একজন সৎ পুলিশ অফিসারের প্রচেষ্টাকে। সেই সাথে চাটনি হিসেবে পুলিশে বিদ্যমান ঈর্ষা এবং দুর্নীতি তো ছিলই। এই ব্যাপারটা আসলেই চোখে পড়ার মত, সম্প্রতি বাংলাদেশী সবগুলো ওয়েব সিরিজই পুলিশকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে দেখানোর ব্যাপারে বেশ সাহসিকতা দেখিয়েছে সব পরিচালকই।
কাকতালীয় কি না জানি না, সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যে কয়টা বাংলাদেশী সিরিজ এসেছে, ১৪ই আগস্ট হোক আর তকদীর কিংবা মহানগরই হোক, সবাই সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছে ক্রাইম। তাই অনেকে বলতে শুরু করেছেন, ওয়েব সিরিজ মানেই ক্রাইম থ্রিলার। আমরা সামাজিক গল্প, কিংবা প্রেমের গল্পের ওপর কি আর ভরসা রাখতে পারছি না? ব্যাপারটা মনে হয় না খুব সুখকর। ক্রাইম থ্রিলার এখন কিন্তু একঘেয়ে হতে শুরু করেছে।
যাই হোক, কাহিনী খুব একটা জমজমাট বলা যায় না। আর মডেল খুন এবং সাসপেক্ট একজন ছাত্রনেতা এই দুটো তথ্য সরবরাহ করলে কমবেশি অনেকের মনেই সন্দেহ জাগবে কাহিনীটা অভি এবং মডেল তিন্নির কাহিনী। যদিও পরিচালক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কাহিনী কাল্পনিক, তারপরও, দর্শক সে কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হচ্ছে না। কাহিনী সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলার নেই। থ্রিল আর এক্সাইটমেন্ট দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কাহিনীকার। বাগানবাড়ী, ক্যাডার দিয়ে খুন করানো, এমনকি পুলিশের দুর্নীতিও। বাট আসেনি। আসলে খুনি কে বুঝে গেলে, সেটা আর ক্রাইম থ্রিলার থাকে না। কিভাবে খুন হয়েছে, আর এভিডেন্স কিভাবে যোগাড় করল, এনিয়ে জমজমাট ক্রাইম থ্রিলার বানানোর চেষ্টা দর্শকদের কতোটা মুগ্ধ করবে, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এনিওয়ে, হোপ ফর দ্যা বেস্ট।
সিরিজটি নিয়ে আরও একটা সমালোচনা বাজারে চলছে। তা হচ্ছে নিশোর চিৎকার। এই সিরিজে ব্যাপারটা অনেকটাই ছোঁয়াচে ছিল। মাহি থেকে শুরু করে এস পি সাহেব, কমবেশি সবাই রেগে গেলে চিৎকার করেছেন। মনে হয় পরিচালক সাহেব রাগ বলতে চিৎকার বোঝেন। রাগ মানেই যে চিৎকার নয়, বিভিন্ন জনের রাগের প্রকাশ যে বিভিন্ন রকম হয়, এটা পরিচালক মাথায় রাখলে ভালো করতেন। অন্ততঃ তেমনটা দেখালে, কাহিনীতে রিপিটেশান ফিল টা কম আসত।
অভিনয়ে নিশো খুব খারাপ করেননি। চিৎকার ব্যাপারটা চোখে লেগেছে। তবে সেটা বাদ দিলে, হি ওয়াজ গুড। জোভানের স্কোপ কম ছিল, তারপরও খারাপ করেননি। বিচ্ছিরী অভিনয় করেছেন মাহি। রোলটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই চিৎকার করে রাগ দেখানো, মডেল সাজবার চেষ্টা আর ন্যাকা ন্যাকা প্রেম, বিরক্তিকর লেগেছে। কিছু কিছু জায়গায় শি ওয়াজ আপ্টু দ্যা মার্ক। সিয়াম বরং ভালো পারফর্ম করেছে। পুলিশের চরিত্রগুলোতে যাদের নেয়া হয়েছে, বেজায় অ্যামেচার। জুম্মন চরিত্রে যে ছেলেটা সে ভালো করেছে।
পরিচালকের জন্য সবচেয়ে বেশি মায়া লেগেছে কাহিনীর শেষটা দেখে। না পারছেন পুলিশকে সফল দেখাতে, কারণ যেভাবে বাবু ভাই চরিত্রটা তৈরি করেছেন, বা যেভাবে দেখাতে চেয়েছেন, ক্ষমতা আর অর্থের কারণে এইসব চরিত্র এখন দানব হয়ে উঠেছে, যার সাথে পুলিশ লড়াই করে উঠতে পারছে না, সেটা টিকিয়ে রাখতে হলে ভিলেইনকে জয়ী করতে হয়। আবার না পারছিলেন পুলিশকে ব্যর্থ দেখাতে। সেটা আবার সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যায়। তাই অবশেষে উনি একটা কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা বের করেন। সেটা অবশ্য হাস্যকর হয়ে গেছে।
সবমিলিয়ে, ইট ওয়াজ অ্যা রিয়েল ডিসাপয়েন্টমেন্ট। মূল কাহিনী গসিপ হিসেবে দারুণ মুখরোচক হলেও, গল্প হিসেবে খুব দারুণ কিছু না। আর পরিশেষে বলব, ডিয়ার পরিচালকস, ক্রাইম থ্রিলারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসুন। আরও গল্প আছে, আর সেসব নিয়ে ভালো সিরিজ হতে পারে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here