মানবপাচার: একটি সামাজিক অভিশাপ

0
42

করোনা মহামারীর থাবায় সারা বিশ্ব আজ নাজেহাল। ভেঙ্গে পড়েছে মানুষের মুখোমুখি যোগাযোগ। এক দেশ থেকে অন্য দেশ এমনকি দেশের অভ্যন্তরে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলাফেরার রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর পড়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা করেছ অনেক রাষ্ট্র। মানবউন্নয়ন সূচকগুলোর উপর বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষার উপর নেমে এসেছে বিপর্যয়। ২০২০ সালে এসে কিছু টিকা আবিষ্কৃত হওয়ায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্ঠা করছে অনেক দেশ। টিকার অপ্রতুলতা এবং করোনার নতুন নতুন ভেরিয়েন্টের হানা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছ প্রতিনিয়ত। করোনাভাইরাসের মহামারীর ভয়াবহতার কাছে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতার জন্য হুমকির অনেক আলোচিত বিষয়। সারা বিশ্বের বিশেষ করে অনুন্নত রাষ্ট্রের জন্য দরিদ্র্যতার পাশাপাশি একটা সামাজিক অভিশাপ মানবপাচার। অনেক আলোচিত বিষয়ের আড়ালে থেকে যায় মানবপাচারের মত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিক্টিমস অফ ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড ভায়েলেন্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানবপাচার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর পাঁচটি ধাপে ‘ট্র্যাফিকিং ইন পারসন’ (টিআইপি) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। প্রতিবেদনে মানবপাচার মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ ও সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের র‌্যাঙ্কিং করে থাকে। তাদের র‌্যাঙ্কিংয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী, যারা পাচারের শিকার হন, তাদের প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণকারী দেশগুলো স্থান পায় প্রথম ধাপে (টায়ার ওয়ান)৷ পাচার রোধে সব উদ্যোগ না নিতে পারলেও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণকারীদের স্থান হয় দ্বিতীয় ধাপে।  (ডি ডব্লিউ, ২৮ জুন ২০১৭)। ২০২১ সালের জুন মাসে প্রকাশিত “2021 Trafficking in Persons Report” এ, ‘স্তর-১’ এ ২৮টি, ‘স্তর-২’ তে ৯৫টি, ‘স্তর-২ পর্যবেক্ষণ’ এ ৪৫টি, ‘স্তর-৩’ তে ১৭টি এবং সর্বশেষ বিশেষ স্তরে ‘লিবিয়া, সোমালিয়া এবং ইয়েমেন’ নামক ৩টি দেশ স্থান পেয়েছে। যে দেশগুলোর অবস্থান তৃতীয় স্তরে স্থান দেয়া হয়েছে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বিদেশি সহায়তা সীমিত করার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ‘স্তর-২ [Tier- 2] ’তে” (পৃষ্টা ৬৭)।

বাংলাদেশের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ১০৯-১১৪ নং পৃষ্টায়। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ‘স্তর-২’ তে অবস্থান করলেও ২০১৮- ২০২০ সালে সূচকে অবনতি হয়ে ‘স্তর-২ পর্যবেক্ষণ’ স্তরে নেমে আসে। ২০২১ সালে সূচকে উন্নতি করে পুনরায় ‘স্তর-২’তে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের বিষয়ে বলা হয়েছে,
“The Government of Bangladesh does not fully meet the minimum standards for the elimination of trafficking but is making significant efforts to do so. The government demonstrated overall increasing efforts compared to the previous reporting period, considering the impact of the COVID-19 pandemic on its anti-trafficking capacity; therefore Bangladesh remained on Tier 2 (2021 Trafficking in Persons Report, p. 109)”

এই প্রচেষ্টার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিশেষত শ্রম পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরও বেশি মামলা দায়ের করা; পাচার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা শুরু এবং একটি ট্রান্সন্যাশনাল পাচার মামলায় বিদেশী সরকারগুলির সাথে সহযোগিতা করার বিষয়টি। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার প্রতিরোধে “মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২” কার্যকর করে। এই ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে’ সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদণ্ড এবং অনূ্যন পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য মানবপাচারের বিষয়টি অনেক উদ্বেগজনক। মানবপাচার সংক্রান্ত্র সংবাদ যেন মিডিয়ার নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। গত ১০ জুন ২০২০ সালে ‘সমকাল’ এ প্রকাশিত “ঝুলে আছে ৬ হাজার মানবপাচার মামলা” বিষয়ক শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, “মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দেশে গত আট বছরে ছয় হাজার ১৩৪টি মামলা হয়েছে। তবে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৩৩টি। বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৫ হাজার ৯০১টি মামলা। এর মধ্যে ৩৩টি মামলায় মাত্র ৫৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। আদালতে সময়মতো আসামি ও সাক্ষী হাজির করতে না পারায় অনেক মামলার শুনানি করা যাচ্ছে না। ফলে বিচারিক আদালতে মামলার কার্যক্রম ঝুলে আছে।”

“ট্র্যাফিকিং ইন পারসন’ ( টিআইপি) ২০২১” প্রতিবেদনটিতে ২০২০ সালের ন্যায় বাংলাদেশ অংশে কুয়েতে মানবপাচার ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগে আটক সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলামের (পাপুল) বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার তদন্ত শুরু করে এবং কুয়েতি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে ২০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে কুয়েতে প্রেরণকারী সংসদ সদস্যের পদ বাতিল করা হয়েছে। সরকার মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার ৯৫ শতাংশ অর্থায়ন করেছে বলেও জানিয়েছে। তাছাড়াও, সরকারের পক্ষ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪,০০০ এরও বেশি পাচারের মামলা তদন্ত বা বিচারের বিচারাধীন থাকার কথা জানানো হয়েছে বলে প্রকাশ করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রনায়িকা পরীমনির আলোচিত মামলার একজন আসামী তুহিন সিদ্দিক ওরফে অমির যার বিরুদ্ধে উঠেছে মানবপাচারের অভিযোগ। গত ২২ জুন ২০২১ সালে ‘সমকাল’ এ প্রকাশিত “সিআইডির সংবাদ সম্মেলন- মানবপাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন অমি ও তার সহযোগীরা” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাইতে ভালো চাকরির কথা বলে শত শত মানুষকে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন মো. তুহিন সিদ্দিক অমি (৩৩) ও তার সহযোগীরা। এভাবে তারা হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা”।

বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে মানুষ কেন মানবপাচারের শিকার হয় সেই প্রশ্নের উত্তরে দুটি বিষয়কে সর্বাধিক আলোচনা করা যেতে পারে, প্রথমত; অসচ্ছলতা এবং দ্বিতীয়ত; বেকারত্ব। দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য মানুষের চেষ্টা একটা চিরাচরিত ব্যাপার। যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থানের পথ দেখায়, নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অনেকে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয়। তারা এই সুযোগকে ব্যাবহার করে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় বিদেশে। পাচারকারীরা তাদের স্বার্থ হাসিল করে অর্থের বিনিময়ে। তাদেরকে তুলে দেয় বিদেশে থাকা তাদের লিয়াজো গ্যাঙের হাতে। নারীদের ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত, অল্প বয়স্ক বিধবা, বা কাজের সন্ধানকারীকে টার্গেট করে পাচারকারীরা। ক্ষেত্র বিশেষে প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাচার করে দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে।অনেক সময় পাচারকারীরা পাচারের শিকার ব্যক্তির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবী করে। পাচারের শিকার এই সমস্ত মানুষের দুঃখের সীমা থাকে না। অনেক মানুষ কোন উপায় না পেয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুর শিকার হয়, দাসত্বের বেড়াজালে আটকে পড়ে সমগ্র জীবন, নারীরা বাধ্য হয় পতিতাবৃত্তিতে, শিশুদেরকে বাধ্য করা অমানুষিক শ্রমের সাথে যুক্ত হতে। অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়। কাউকে পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেওয়া, শরীরকে আয়রন দিয়ে ঝলসে দেয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। অনেকটা দাসের মত কাটতে থাকে দিনগুলো।

বাংলাদেশ সরকারের গোচরে এলে পাচারের শিকার বিদেশকর্মীদের দেশে ফেরত আনার পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ফেরত আসার পরে পাচারের শিকার নারী বা পুরুষের বিমর্ষ চেহারা বলে দেয় তাদের জীবনের ভয়াবহতা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অনেকটা আড়ালে চলে যায় কে বা কাদের শিকার হয়ে তাদের জীবনে নেমে এলো এমন দুর্বিষহতা। কেন, কিভাবে তারা শিকার হল, কে বা কারা জড়িত, উদ্দেশ্য কি; মানবপাচারের সেই বিষয়গুলো থেকে যায় অজানা। তবে, ভুক্তভোগীরা এই অপরাধ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে, ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত ও উদ্ধার এবং পুনর্বাসনের পথে সহায়তা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।বাংলাদেশে মানবপাচারকে নিরোধের লক্ষে “মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২” প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার বৃদ্ধির সাথে সাথে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে ভোগান্তির শিকার মানুষের অভিজ্ঞতাকে। প্রয়োজনে “পাচারের শিকার মানুষের ভোগান্তির বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ এবং গবেষণার জন্য” একটা বিশেষ বিভাগ গঠন করা যেতে পারে। এই সামাজিক অভিশাপকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে মানবজীবনে নেমে আসবে চরম বিপর্যয়। সূত্র : চ্যানেল আই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here