সালাতুল জুমা খুলে দেয় রহমতের দ্বার

0
32

 সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন শুক্রবার। রহমত ও বরকতে পূর্ণ এই দিনটি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সাধারণ মুসলমানের কল্যাণের জন্য এই দিনটিতে এমন কিছু মাহাত্ম্য নিহিত রেখেছেন যা অন্য দিনগুলোকে নেই। এইদিনে সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে। পাপী-তাপী ও পুণ্যবানদের বিনয়ী হাত আল্লাহর কাছে পাপ মুক্তির প্রার্থনা করে। সওয়াব লাভের এমন সুযোগ কেবল ঐ সমস্ত বান্দার হয়, যারা সন্তুষ্ট চিত্তে এইদিন মসজিদে হাজির হয়ে নামাজ আদায় করে। এই দিনে প্রতিটি মুমিন অন্তর এক অন্যরকম আনন্দ উপভোগ করে। মসজিদে আজান হবার সাথে সাথে মুসল্লিরা মসজিদে ছুটে যায়। শুরু হয় পুণ্যের এক প্রতিযোগিতা। আল্লাহকে খুশি করার প্রচেষ্টা। যাতে ব্যক্তি অর্জন করতে পারে আল্লাহর তরফ থেকে সেই বিশেষ পুরস্কার, যার ওয়াদা তিনি করেছেন।

মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। কিন্তু দেখা যায় অনেক মানুষের মনোযোগ কাজেই রয়ে যায়। নামাজে সে অংশ নেয় না। মনে সেই আগ্রহ অনুভব করে না। আসলে এরা ক্ষতিগ্রস্তদের দলে। সেকথা তারা নিজেরাও বুঝতে চায় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘ হে মানবমণ্ডলী, তোমরা যারা ইমান এনেছো, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কখনো তোমাদের যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। আর যারা এই কাজ করবে তারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (সূরা আল মোনাফেকুন, আয়াত-০৯)।

এই জুমার দিনে আজান হবার পরেও যারা ঘরে বসে থাকে অথবা ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে মগ্ন থেকে আল্লাহর আহ্বানকে বেমালুম ভুলে যায় তাদের উপর আল্লাহ অত্যন্ত বেজার। তিনি তার রহমত থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দেন। এই সব মানুষকে লক্ষ করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহর কঠোর ভাষায় বলেছেন,‘হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন তোমাদের নামাজের দিকে ডাকা হবে তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাও। নামাজের এই সময়ে কেনাবেচা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। যদি তোমরা তা বুঝতে পারো।’ (সূরা আল জুমুয়াহ, আয়াত-০৯)।

জুমার নামাজ আজকাল অনেকের কাছে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায় মানুষ ইচ্ছে করে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ছেড়ে দেয়। শরয়ী কোনো ওজর নেই। জুমার দিন তাড়াতাড়ি সামনের সারিতে গিয়ে বসে। বিষয়টি অবশ্যই ভালো। হয়তো এ কারণেও সে পূর্ণ নামাজি হবার প্রেরণা পেতে পারে। কিন্তু দেখা যায় অনেকেই যখন ফরজ দু’রাকাত নামাজ আদায় হয়ে যায়, সুন্নত নামাজের জন্য আর অপেক্ষা করে না। মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। অনেকের থাকে নানা প্রয়োজন। কারো বহু জরুরত। কেউবা এভাবেই অভ্যস্ত। এসব নামাজিকে লক্ষ করে আল্লাহ বলেন,‘এরা যখন কোনো ব্যবসায়িক কাজকর্ম বা ক্রীড়াকৌতুক দেখতে পায়, সেদিকে তারা দ্রুত গতিতে দৌড়ায়। তোমাকে নামাজে একা দাঁড়ানো অবস্থায় ফেলে যায়। তুমি বলো, আল্লাহ তায়ালার নিকট যা কিছু আছে তা খেলাধুলা ও বেচাকেনার চেয়ে অবশ্যই উত্তম। মূলত আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা আল মোনাফেকুন, আয়াত-১১)।

এই মানুষগুলো যদি ফরজ নামাজ ছেড়ে না দিতো, বিনা কারণে নামাজকে কাযা না করতো, জামায়াতের সহিত নামাজ আদায় করতো, আল্লাহ তায়ালা এদের উপর অত্যন্ত খুশি হতেন। এই ব্যক্তিগণ যখন খালিস নিয়তে মসজিদে ছুটে আসত প্রতি কদমে পেয়ে যেত অগণিত সওয়াব। তাই যারা ফরজ নামাজকে ঐচ্ছিক নামাজে পরিণত করেছে তাদের উচিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। এই ওয়াদা করা, জীবনে আর নামাজ ছেড়ে দেবে না। হয়তো তাহলে দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। তাদের পাপরাজিকে ক্ষমা করে দেবেন। ‘আল্লাহ তায়ালার রয়েছে বিশাল অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তাকেই তিনি এই অনুগ্রহ দান করেন।’ (সূরা আল জুমুয়াহ, আয়াত-০৪)।

মানুষ যদি সত্যিভাবে এই জুমার কদর বুঝত কখনোই এই জুমার নামাজকে ছেড়ে দিতো না। কত মর্যাদার অধিকারী করা হয়েছে এই নামাজ আদায়কারীকে। রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন,‘জুমার দিন মসজিদের প্রত্যেক দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করে। আর তালিকা ধরে আগে-পরের হিসেব করে জুমার নামাজে আগমনকারীদের নাম লিপিবদ্ধ করতে থাকে। এই কাজ চলতে থাকে। কিন্তু ইমাম যখন মিম্বরে বসেন, তারা লেখা বন্ধ করে দেয়। খুতবা শোনার জন্য চলে আসে। মসজিদে যে আগে এলো, তার উদাহরণ ঐ ব্যক্তির মতো যে একটি উটনী কোরবানি করেছে। তার পরে যে এরো তার দৃষ্টান্ত যে একটি গাভী কোরবানি করেছে। এরপর যে এলো তার উদাহরণ যে একটি ভেড়া কোরবানি করেছে। তার পরের জনের দৃষ্টান্ত যে একটি মুরগি দান করেছে। এর পরে যে এলো যে একটি ডিম দান করেছে।’ (মুসলিম, হাদিস- ২০২১)। তাই এই ধরণের কবুল সওয়াব লাভের আশায় অবশ্যই জুমার দিন তাড়াতাড়ি মসজিদে আসতে হবে।

রসুল (সা.) এর ফজিলত সম্পর্কে আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে নিজে সকাল সকাল গোসল করল এবং অন্যকে গোসল করালো, এরপর ইমামের কাছে গিয়ে বসে মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনল, ঐ ব্যক্তির প্রত্যেক কদমের বিনিময়ে সে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস- ৪৯৮)।

তিনি আরও বলেছেন,‘জুমার দিনে যে ব্যক্তি গোসল করে জুমার নামাজে যায়, সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ আদায় করে, তারপর ইমামের খুতবা শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে। ইমামের সাথে নামাজ আদায় করে। এমন ব্যক্তির তার এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত ও অতিরিক্ত আরো তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম, হাদিস- ২০২৪)।

অনেক মানুষ অবজ্ঞা বশত এই নামাজকে ছেড়ে দেয়। তাই বিনা কারণে এই নামাজ পরিত্যাগ করা যাবে না। শরয়ী কোনো ওজর থাকলে সেটি ভিন্ন কথা। তখন ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। শরিয়ত তাকে এই সুযোগ দিয়েছে। অন্যথায় ‘যে ব্যক্তি অবহেলা করে পরপর তিন জুমা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার অন্তর মোহরাঙ্কিত করে দেন।’ (তিরমিজি, হাদিস- ৫০২)। তাই রসুলের এই কঠিন সকর্তবাণী উপেক্ষা করে জুমা ছেড়ে দেওয়া কোনো মুমিন মুসলমানের ইমানি সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here